নিজস্ব প্রতিবেদক, ক্রাইম ক্রনিকল


মাদক পাচার রোধে গত শুক্রবার (০৮ মে) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভী চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।


মাদকদ্রব্যের অবৈধ পাচার, অর্থ পাচার ও অপব্যবহার প্রতিরোধে দুই দেশ তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাদকবিরোধী অভিযান আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনার অঙ্গীকার নিয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় নিয়মিত ও অপারেশনাল তথ্য বিনিময়ের জন্য ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং পাকিস্তানের পক্ষে এন্টি নারকোটিকস ফোর্স (এএনএফ) নির্ধারিত হয়েছে। চুক্তিটি স্বাক্ষরের তারিখ থেকে আগামী ১০ বছরের জন্য কার্যকর থাকবে।


তবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। একই দিন রাত প্রায় ১১টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের পাথারিয়াদ্বার সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হন। নিহতরা হলেন মোহাম্মদ মুরসালিন (২০) এবং নবীর হোসেন (৫৫)।

ঘটনার প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে রোববার দুপুরে নিহতদের মরদেহ বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।


বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ জন বাংলাদেশি চোরাচালানের উদ্দেশ্যে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিলেন। ফেরার পথে বিএসএফ সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। বিজিবির পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিএসএফের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে, বিএসএফের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে যে টহলরত জওয়ানরা চোরাচালানকারীদের আটকাতে গেলে তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়। তবে ঘটনাস্থলের স্থানীয় বাসিন্দারা এবং বিজিবি কর্মকর্তারা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, কোনো ধরনের সংঘর্ষ বা আক্রমণের ঘটনা তাঁদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিবির এক কর্মকর্তা বলেন, "সীমান্তের ওপার থেকে হঠাৎ করেই গুলি আসতে থাকে।"


নিহত মুরসালিন ও নবীরের পরিবারে এখন শোকের ছায়া। মুরসালিনের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "ছেলেটা গরু নিয়ে বাড়ি ফিরবে বলেছিল। সীমান্তের ওপার থেকে হঠাৎ গুলি এলো কেন?"

স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মালেক বলেন, "এলাকার মানুষ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নয়, জীবিকার টানে সীমান্তবর্তী এলাকায় যাতায়াত করে। অথচ বিএসএফের গুলিতে বারবার নিরীহ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে।"


সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ঘটনার সময়কালকে কাকতালীয় মনে করছেন না।


এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "কোনো ব্যক্তি সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করলেও তাঁকে গুলি করে হত্যা করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিনা বিচারে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার এই নির্মম প্রবণতা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়।"

আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৯ মে পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে কমপক্ষে ছয়জন বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন এই ধরনের ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ করছে, তেমনি সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিচ্ছে।