স্টাফ রিপোর্টার, ক্রাইম ক্রনিকল


কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত ও চরাঞ্চলে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে গরু চোর ও চোরাচালান চক্র। বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ, সিলেটের জকিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তজুড়ে গত কয়েক দিনে চোরাই গরু উদ্ধার, পাচারচক্রের তৎপরতা এবং খামারিদের উদ্বেগের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অভিযান ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে খামারিদের অভিযোগ—চোরাচালান পুরোপুরি থামছে না।


বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে শনিবার দড়িচর খাজুরিয়া ইউনিয়নের বামনের চর এলাকায় অভিযান চালিয়ে বাছুরসহ ২৫ থেকে ২৬টি চোরাই গরু জব্দ করে পুলিশ। কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, গরুগুলো কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য চরাঞ্চলে মজুত করা হয়েছিল। এ ঘটনায় রাসেল দেওয়ান, ইমন দেওয়ান ও রাকিব দেওয়ান নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, রাসেল ও ইমনের বিরুদ্ধে চুরি ও নৌ ডাকাতিসহ একাধিক মামলার ওয়ারেন্ট রয়েছে।


মেহেন্দিগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মতিউর রহমান বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চুরি হওয়া গরু এনে চরাঞ্চলে লুকিয়ে রাখা হচ্ছিল। স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, ওই ইউনিয়নের বিভিন্ন বাড়িতে এখনো অর্ধশতাধিক চোরাই গরু মজুত থাকতে পারে।


এদিকে, সীমান্তবর্তী সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় ভারত থেকে চোরাই পথে গরু প্রবেশের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বাল্লাহ ও আটগ্রাম সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে গরু দেশে ঢুকছে বলে স্থানীয়দের দাবি। সীমান্তসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ঈদ সামনে রেখে কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা গভীর রাতে গ্রামীণ সড়ক, ফসলি জমি ও দুর্গম সীমান্তপথ ব্যবহার করে গরু নিয়ে আসছে।


স্থানীয় বৈধ পশু ব্যবসায়ীরা বলছেন, চোরাই গরুর কারণে বাজারে অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। এতে দেশীয় খামারি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। জকিগঞ্জ থানার পুলিশ জানিয়েছে, সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান চালানো হচ্ছে।


সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জেও পৃথক অভিযানে চোরাই ৩টি গরু ও ১টি ছাগলসহ একটি পিকআপ জব্দ করেছে পুলিশ। উপজেলার ষোলমাইল এলাকায় সন্দেহজনক একটি পিকআপে তল্লাশি চালিয়ে গবাদিপশুগুলো উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, সংশ্লিষ্টরা পশুগুলোর বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এগুলো চোরাইকৃত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।


রায়গঞ্জ থানার ওসি আহসানুজ্জামান বলেন, চুরি, ডাকাতি ও মাদকসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চলছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পুলিশ।


সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে। পদ্মা নদীসংলগ্ন চরাঞ্চল ও কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত ব্যবহার করে প্রতিদিন শত শত ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রাত গভীর হলে চোরাচালান চক্রের ‘লাইনম্যানরা’ সক্রিয় হয়ে ওঠে। পরে ছোট ছোট দলে গরু এনে দেশের বিভিন্ন হাটে সরবরাহ করা হয়।


খামারিরা বলছেন, ভারতীয় গরুর কারণে স্থানীয় বাজারে দাম কমে গেছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। শিবগঞ্জ উপজেলার কয়েকজন খামারি জানান, খাদ্য ও পরিচর্যার ব্যয় বাড়লেও আশানুরূপ দাম পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই লোকসানের আশঙ্কায় আছেন।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, করোনার পর থেকেই লোকসান সামলে খামার টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। এখন আবার সীমান্ত দিয়ে চোরাই গরু প্রবেশ করায় খামারিরা নতুন সংকটে পড়েছেন।


তবে বিজিবি দাবি করেছে, সীমান্তে জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান চলছে। ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নাইট ভিশন ক্যামেরাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে গরু আনার চেষ্টা ঠেকাতে গোয়েন্দা তৎপরতাও জোরদার করা হয়েছে।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে গবাদিপশুর চাহিদা বাড়ায় প্রতিবছরই চোরাচালান ও গরু চুরির ঘটনা বাড়ে। তবে এবার তা আরও বিস্তৃত আকার নিয়েছে। সীমান্ত ও চরাঞ্চলে কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।