স্টাফ রিপোর্টার, ক্রাইম ক্রনিকল

আর মাত্র কয়েক দিন পরই পবিত্র ঈদুল আজহা। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা–উপজেলায় জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। কোথাও বাড়ছে পশুর আমদানি ও বেচাকেনা, কোথাও আবার ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও বাজারে দেখা যাচ্ছে ধীরগতি। একই সঙ্গে সামনে আসছে জালনোট চক্রের তৎপরতা, হাট ইজারা নিয়ে সিন্ডিকেটের অভিযোগ, অবৈধ হাটের আশঙ্কা এবং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশঝুঁকির নানা প্রশ্ন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোরবানিকে কেন্দ্র করে এবার দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক লেনদেন এক লাখ কোটি টাকার বেশি হতে পারে। ফলে কোরবানির পশুর হাট এখন শুধু ধর্মীয় উৎসবের অংশ নয়, দেশের বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও কেন্দ্রবিন্দু।

উত্তরবঙ্গের বড় হাটে বাড়ছে বেচাকেনা

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা পশুর হাট উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় ও ঐতিহ্যবাহী গবাদিপশুর বাজার। প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার বসা এই হাটে সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা, নাটোর, জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে খামারি ও ব্যবসায়ীরা গরু, ছাগল ও ভেড়া নিয়ে আসেন।

বগুড়া–পাবনা মহাসড়কের পাশে হওয়ায় হাটটিতে যাতায়াত সহজ। বিশেষ করে দেশি জাতের মাঝারি ও ছোট আকৃতির গরুর চাহিদা এবারও বেশি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

রায়গঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আমিনুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় খামারিদের উৎপাদিত পশু ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সুযোগ তৈরি করছে এই হাট। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নিরাপদ বেচাকেনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, কোরবানির মৌসুম সামনে রেখে ক্রেতা–বিক্রেতাদের নিরাপত্তা, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার সুলতানগঞ্জ পশুর হাটেও জমতে শুরু করেছে বেচাকেনা। শুক্রবারের হাটে পশুর আমদানি ও বিক্রি তুলনামূলক কম থাকলেও ক্রেতাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

খামারি ও ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার পশুর দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কম। দেশি জাতের ছোট ও মাঝারি ষাঁড় বিক্রি হয়েছে ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকায়। বড় আকারের শাহীওয়াল, হোলস্টাইন ফ্রিজিয়ান ও সংকর জাতের গরুর দাম ছিল আড়াই লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত।

হাটে পুলিশ ও র‌্যাবের নজরদারির পাশাপাশি জালনোট শনাক্তকরণ বুথ এবং ভেটেরিনারি মেডিক্যাল ক্যাম্পও ছিল।

রাজধানীতে বসবে ২৬টি পশুর হাট

এবার রাজধানীতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ২৬টি কোরবানির পশুর হাট বসবে। এর মধ্যে দুই সিটিতে ১২টি করে অস্থায়ী হাটের পাশাপাশি থাকবে গাবতলী ও সারুলিয়ার স্থায়ী হাট।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় পোস্তগোলা, আফতাবনগর, শ্যামপুর–কদমতলী, বনশ্রী, গোলাপবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় হাট বসবে। অন্যদিকে উত্তর সিটিতে মিরপুর, কালশী, বছিলা, দিয়াবাড়ি, ভাটারা ও কাঁচকুড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী হাট নির্ধারণ করা হয়েছে।

যদিও প্রতিবছরের মতো এবারও নির্ধারিত সময়ের আগেই অনেক স্থানে পশু ওঠানো ও বেচাকেনা শুরু হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সিলেটে হাট ইজারা নিয়ে প্রশ্ন

সিলেট সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার বদলে সমঝোতার মাধ্যমে আগেভাগেই ইজারাদার নির্ধারণ করা হয়েছে।

এবার সিসিক পাঁচটি অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা দিয়েছে। অথচ আগের বছরগুলোতে সাত থেকে নয়টি পর্যন্ত হাট বসত। এতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ হাট বসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে শাহি ঈদগাহ, মদিনা মার্কেট, রিকাবিবাজার, কদমতলী, সুবিদবাজার ও উপশহর এলাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতির খবর পাওয়া গেছে।

সচেতন মহলের অভিযোগ, পরিচ্ছন্নতা খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় দেখিয়ে রাজস্ব কাঠামো জটিল করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিসিক প্রশাসক মো. আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তাঁর দাবি, হাট কম হলেও সামগ্রিক রাজস্ব কমেনি।

পশুর হাটে সক্রিয় জালনোট চক্র

প্রতিবছরের মতো এবারও কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জালনোট চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হাটের ভিড় ও দ্রুত নগদ লেনদেনের সুযোগ নিয়ে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জালনোট।
                     জাল নোট। ছবি: সংগৃহীত 
শুধু অফলাইন নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশ্যে চলছে ‘এ গ্রেড’ জালনোটের বিজ্ঞাপন। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ‘জালটাকা বানাই’, ‘এ গ্রেড জাল নোট পাইকারি’—এমন নামের পেজ ও গ্রুপের মাধ্যমে অর্ডার নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা, টঙ্গী, মতিঝিল ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডিবি ও র‌্যাব একাধিক জালনোট চক্রের সদস্যকে আটক করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে জালনোট তৈরির মেশিন, প্রিন্টার, স্ক্যানার ও বিপুল পরিমাণ জাল টাকা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাবতলীসহ বড় হাটগুলোতে জালনোট শনাক্তকরণ মেশিন বসানো হচ্ছে। পাশাপাশি থাকবে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত।

জনস্বাস্থ্য ও পশুকল্যাণ নিয়ে উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরবানির হাট শুধু অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রায় ৬০ শতাংশ সংক্রামক রোগ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স ও ব্রুসেলোসিসের মতো রোগ এখনো জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক হাটেই পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল। আবার পশু পরিবহনের সময় গাদাগাদি করে তোলা, দীর্ঘ সময় পানি ছাড়া রাখা এবং অমানবিক আচরণের অভিযোগও রয়েছে।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, কোরবানির হাটকে স্বাস্থ্যসম্মত, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। পশুর স্বাস্থ্য সনদ, ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম, সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত হাট পরিচালনা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাড়ছে অনলাইন পশুর হাট

প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অনলাইন পশুর হাটও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই পশু পছন্দ, দরদাম ও বুকিং করছেন ক্রেতারা।

বিক্রেতারা বলছেন, এতে সময় ও পরিবহন খরচ কমছে। তবে সরাসরি পশু না দেখে কেনাকাটার কারণে প্রতারণা, অতিরিক্ত দাম আদায় এবং নির্ধারিত সময়ে ডেলিভারি না দেওয়ার অভিযোগও বাড়ছে।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন থেকে পশু কেনার ক্ষেত্রে বিক্রেতার তথ্য যাচাই এবং সম্ভব হলে ভিডিও কলে পশু দেখে নেওয়া উচিত।

হাটে যাওয়ার আগে সতর্কতা

কোরবানির পশু কিনতে গেলে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। হাটে আরামদায়ক পোশাক ও জুতা ব্যবহার, সঙ্গে পানি ও ছাতা রাখা, পশুর দাঁত দেখে বয়স যাচাই করা এবং কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশু এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বেচাকেনার পর হাসিলের রসিদ সংগ্রহ এবং জালনোট এড়াতে টাকা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কোনো সমস্যায় পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ বা র‌্যাবের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।