স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল
মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনে নির্মাণ খাতে চাকরির প্রতিশ্রুতি। সেই আশ্বাসে পরিবার ছেড়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন গোপালগঞ্জের তিন যুবক। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের সামরিক পোশাক পরিয়ে ইউক্রেন সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবারগুলো।
ভুক্তভোগীরা হলেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ঘোষেরচর উত্তরপাড়া গ্রামের পলাশ শেখ, সিতারকুল গ্রামের রনি এবং বলাকৈড় গ্রামের সৌরভ মোল্লা। তাঁদের পরিবারের দাবি, ঢাকার রিক্রুটিং এজেন্সি ‘জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের রাশিয়ায় পাঠায়। গত ৭ মে এই তিনজনসহ প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি একই ফ্লাইটে রাশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন।

স্বজনেরা জানান, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর থেকেই যুবকদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। পরে এসএমএস ও অডিও বার্তায় তাঁরা জানান, তাঁদের ফোন জব্দ করা হয়েছে, চুক্তিপত্রে জোর করে সই নেওয়া হয়েছে এবং মাথার চুল কেটে সামরিক ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে।
রনির স্ত্রী তিষা বলেন, ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁর স্বামী দালালের মাধ্যমে ওই রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর কয়েক দিন কোনো যোগাযোগ ছিল না। পরে রনি জানান, তাঁদের সীমান্তবর্তী একটি ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৮ মে কথা হয়। তখন তিনি বলেন, ক্যাম্পের আশপাশে সারাক্ষণ গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে।সৌরভ মোল্লার চাচি লিমা আক্তার সুখী বলেন, ১৭ মে ভিডিও কলে সৌরভকে সেনাবাহিনীর মতো পরিবেশে দেখা গেছে। তাঁর আচরণও স্বাভাবিক মনে হয়নি। পরিবারের সদস্যরা ধারণা করছেন, তাঁদের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
পলাশ শেখের ফুপাতো ভাই আবু সালেহ বলেন, ‘প্রো টেকনোলজি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে পলাশকে পাঠানো হয়েছিল। পরে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁকে রাশিয়ান আর্মির একটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, রিক্রুটিং এজেন্সিটি আগে থেকেই পুরো বিষয়টি জানত।
এ ঘটনায় পরিবারগুলো ঢাকার খিলক্ষেত থানায় অভিযোগ দিয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন বলেন, অভিযোগটি সাধারণ ডায়েরি হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। যেহেতু তাঁরা বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশে গেছেন, তাই জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তবে বিএমইটির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে গিয়ে কাউকে জোরপূর্বক যুদ্ধ বা অন্য কাজে নিয়োজিত করা হলে সেটি মানবপাচারের আওতায় পড়তে পারে। সংস্থাটির এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বৈধ কাগজপত্রে বিদেশ গেলেও পরে যদি প্রতারণা বা জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা হয়, তাহলে সেটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা কৌশিক আহমেদ বলেন, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বলেন, শুরুতে তাঁদের কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। পরে জানা গেছে, বাংলাদেশিরা সেখানে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, অন্তত আটজন বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।