নিজস্ব প্রতিবেদক। ক্রাইম ক্রনিকল


রাজধানীর চিরচেনা ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এবার মাঠে নেমেছে অদৃশ্য ডিজিটাল পুলিশ। ট্রাফিক আইন ভাঙলেই আর পার পাওয়ার সুযোগ নেই।নিমিষেই ধরা পড়তে হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) নিখুঁত ক্যামেরায়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ মে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরুর পর মাত্র দুই সপ্তাহে ডিএমপির সার্ভারে জমা পড়েছে প্রায় ১২ হাজার আইন লঙ্ঘনের ভিডিও ফুটেজ। এর মধ্যে নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করে ইতিমধ্যেই ৫৪৮ জন অবাধ্য চালকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্রসিকিউশনের মাধ্যমে অটো-মামলা দেওয়া হয়েছে। আপাতত রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, শাহবাগ, বাংলামোটর, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্রসিং ও এয়ারপোর্ট রোডসহ প্রধান প্রধান পয়েন্টে এই অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তিসম্পন্ন সিসি ক্যামেরা সচল করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরো ঢাকা শহরকে এই ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।


মোড়ে মোড়ে বসানো এই বিশেষ পিটিজেড (Pan-Tilt-Zoom) ক্যামেরাগুলো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরতে পারে এবং অনেক দূর থেকেও গাড়ির নম্বর প্লেট নিখুঁতভাবে রিড করতে সক্ষম। ডিএমপি সদর দপ্তরের সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টারে থাকা ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ ভায়োলেশন ডিটেকশন সফটওয়্যার’ মূলত সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মের ওপর ভিত্তি করে অপরাধীদের চিহ্নিত করছে। আইন ভাঙার সাথে সাথেই গাড়ির মালিকের নিবন্ধিত মোবাইলে চলে যাচ্ছে অটো-জেনারেটেড মামলার বার্তা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুরুতে ট্রাফিক সিগন্যালের কয়েকটি নির্দিষ্ট অপরাধ যেমন—লাল বাতি অমান্য করে সিগন্যাল পার হওয়া, জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা, স্টপ লাইনের সীমানা অতিক্রম করা এবং উল্টো পথে গাড়ি চালানোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ট্রাফিক বিভাগের টেকনিক্যাল টিম জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহ থেকে এই নজরদারি আরও কঠোর হচ্ছে, যেখানে গাড়িতে সিট বেল্ট না বাঁধা কিংবা মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীর হেলমেট না থাকার মতো অপরাধগুলোকেও অটো-মামলার আওতায় আনা হবে।


সরেজমিনে কারওয়ান বাজার ও বিজয় সরণি মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে এক অভূতপূর্ব চিত্র। সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলার সাথে সাথেই চালকেরা স্বপ্রণোদিত হয়ে স্টপ লাইনের পেছনে গাড়ি থামাচ্ছেন এবং জেব্রা ক্রসিং সম্পূর্ণ খালি রাখছেন। কর্তব্যরত একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, আগে পুলিশ না থাকলে বা চোখ ফাঁকি দিয়ে সিগন্যাল ভাঙার যে প্রবণতা ছিল, ক্যামেরার ভয়ে তা উধাও হয়েছে। এখন আর তাদের রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ম্যানুয়ালি কাগজ চেক করার ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না, সব কাজ আড়ালে থাকা প্রযুক্তিই করে দিচ্ছে। ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইন অমান্যকারীদের পাঠানো নোটিশের পর অনেকেই ইতিমধ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধ করছেন। তবে যারা নোটিশ পাওয়ার পরও জরিমানা দেবেন না, তাদের বিরুদ্ধে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে সরাসরি সমন ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। ডিজিটাল এই কড়াকড়ির ফলে ঢাকার সড়কে দীর্ঘদিনের জঞ্জাল ও বিশৃঙ্খলা অবশেষে কমতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অপরাধ ও ট্রাফিক বিশেষজ্ঞরা।