নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
রাজধানীর তুরাগ নদী থেকে উদ্ধার হওয়া বস্তাবন্দী অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি একটি চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ঢাকা মেট্রো (উত্তর)।
এ ঘটনায় জড়িত হানিট্র্যাপ ও মুক্তিপণ আদায়কারী চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিহতের লুণ্ঠিত প্রাইভেটকারও উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ মে ২০২৬ তারিখ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মো. লোকমান সরদার (৩৮) কুড়িলের বাসা থেকে ভাড়ায় প্রাইভেটকার চালানোর উদ্দেশ্যে বের হন। দীর্ঘ সময় পার হলেও তিনি বাড়িতে ফিরে না আসায় তার স্ত্রী ফারজানা আক্তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
পরবর্তীতে বরিশালের গৌরনদী থানা পুলিশের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, লোকমান সরদারকে হত্যা করা হয়েছে। তার মরদেহ দক্ষিণখান এলাকার ফায়দাবাদ রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদীতে একটি প্লাস্টিকের বস্তার ভেতরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিহতের কাঁধ থেকে হাতের আঙুল পর্যন্ত চামড়া ছিল ছোলা, বাম হাতের কনুই থেকে নিচের অংশ এবং বাম পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ ভাঙা ছিল। নির্মম নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করে বস্তাবন্দী অবস্থায় নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী ফারজানা আক্তার বাদী হয়ে গত ২ জুন দক্ষিণখান থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে পিবিআই, ঢাকা মেট্রো (উত্তর) স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত শুরু করে। মামলাটির তদন্ত করছেন পিবিআইয়ের এসআই জাকারিয়া আলম।
তদন্তে বেরিয়ে আসে, গ্রেপ্তারকৃত সালমানের কথিত স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস মীম ওরফে আনিবা জারা কৌশলে লোকমান সরদারকে টঙ্গী পশ্চিম থানার পাখির বাজার এলাকার হোন্ডা রোডে ডেকে নেন। সেখানে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সালমান, আদিব ইসলাম (১৯), সবুজ মিয়া, রাকিবসহ আরও কয়েকজন সহযোগী মিলে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন চালায়।
একপর্যায়ে মাদক সেবনের অভিযোগ তুলে ভিকটিমের কাছ থেকে মুক্তিপণ হিসেবে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। পরে তাকে বেধড়ক মারধর করে গুরুতর আহত অবস্থায় হাত-পা বেঁধে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার ব্যবহৃত প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্রো-গ-২৮-১৬৬৮) ছিনিয়ে নিয়ে আসামিরা আত্মগোপনে চলে যায়।
পিবিআইয়ের একটি বিশেষ দল বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় অভিযান চালিয়ে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকা থেকে আদিব ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া রাজধানীর খিলক্ষেতের পূর্ব নামাপাড়া এলাকা থেকে এস এম সালমান ও জান্নাতুল ফেরদৌস মীমকে এবং টঙ্গী পশ্চিম থানার পাখির বাজার মাজার বস্তি এলাকা থেকে সবুজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানের ধারাবাহিকতায় গত ৪ জুন গাজীপুরের গাছা থানার পশ্চিম ঝাঝর উত্তর খাইলকৈর ভিটাজমি এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন অবস্থায় নিহতের লুণ্ঠিত প্রাইভেটকার উদ্ধার করা হয়। পরে গাড়িটির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর যাচাই করে এর সঠিকতা নিশ্চিত করা হয়।
পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত এস এম সালমান আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করেছেন এবং পলাতক অন্যান্য সহযোগীদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।
পিবিআই আরও জানায়, হানিট্র্যাপ চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।