ক্রাইম ক্রনিকল বিশ্লেষণ


২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে শুরু থেকেই সমর্থকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিয়ে নানা ধরনের উদ্বেগ ছিল। তবে এবার বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন খোদ ফিফার মনোনীত একজন রেফারি। সোমালিয়ার আন্তর্জাতিক রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার ঘটনায় বিশ্বকাপ আয়োজন, অভিবাসন নীতি এবং ফিফার কার্যকর কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত ৫২ জন রেফারির একজন ছিলেন আরতান। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে অন্যান্য রেফারিদের সঙ্গে যোগ দিতে যাওয়ার পর তিনি অভিবাসন কর্মকর্তাদের প্রায় ১১ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন। পরে কয়েক ঘণ্টা আটক রাখার পর তাকে ফেরত পাঠানো হয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিসক্রিমিনেশন ক্যাম্পেইন গ্রুপ ফেয়ারের নির্বাহী পরিচালক পিয়ারা প্যোওয়ার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আদর্শিক ও বৈষম্যমূলক আচরণের আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছিল। তার মতে, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে অংশ নিতে আসা ফিফার একজন আনুষ্ঠানিক রেফারিকে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী।

স্বপ্নভঙ্গ সোমালিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ রেফারির

ওমর আরতানের জন্য ২০২৫ সাল ছিল উল্লেখযোগ্য সাফল্যের বছর। তিনি প্রথম সোমালি হিসেবে কোনো মহাদেশীয় ক্লাব প্রতিযোগিতার ফাইনাল পরিচালনার দায়িত্ব পান। ২০২৫ সালের জুনে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পিরামিডস এফসি ও মামেলোদি সানডাউনসের মধ্যকার দ্বিতীয় লেগের ম্যাচ পরিচালনা করেন তিনি।

পরবর্তীতে ফিফা তাকে চিলিতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে নিয়োগ দেয়, যেখানে তিনি তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচসহ তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেন। একই বছর তিনি আফ্রিকা কাপ অব নেশনসেও দায়িত্ব পালন করেন।


ওমর আরতান গত ১২ মাসে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল এবং চিলিতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রেফারির দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগৃহীত ছবি।


২০২৬ সালের মার্চে বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত হওয়া ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।

বিবিসি সোমালিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরতান বলেছিলেন, “প্রত্যেক রেফারির স্বপ্ন বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করা। নির্বাচিত হওয়ার মুহূর্তে মনে হয়েছিল দীর্ঘ বছরের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।”

বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম সোমালি রেফারি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাকে নিজ দেশ সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুতে ফিরে যেতে হয়েছে।

‘সব কাগজপত্র ঠিক ছিল’

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসকে আরতান জানান, তার কাছে বৈধ ভিসাসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ছিল। তবুও তাকে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করলেও বলেন, সীমান্ত ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে তিনি যথাযথ বলে মনে করেন।

ঘটনাটি অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে এমন একটি বার্তা দিচ্ছে যে, বর্তমান মার্কিন অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, খেলোয়াড় প্রতিনিধি কিংবা সমর্থকদের জন্যও কোনো স্বয়ংক্রিয় ছাড় বা বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত নয়।

ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার ইয়ান রাইট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “প্রতি কয়েক ঘণ্টা পরপর নতুন কোনো খবর আসছে—কোথাও সমর্থক, কোথাও খেলোয়াড়, কোথাও কর্মকর্তা, কোথাও সাংবাদিক, এখন রেফারিও বাধার মুখে। এটি যেন বিশৃঙ্খলার বিশ্বকাপ।”

ট্রাম্পের নীতি ও পুরোনো বিতর্ক

গত দুই বছর ধরে ফিফা সভাপতি জান্নি ইনফান্তিনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। গত ডিসেম্বর বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানের সময় ট্রাম্পকে বিতর্কিতভাবে প্রথম ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।



ফিফা সভাপতি জান্নি ইনফান্তিনো গত দুই বছর ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছেন। সংগৃহীত ছবি।


এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, জানুয়ারির শুরুতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে মার্কিন বাহিনী দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এর ফলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ একটি অংশগ্রহণকারী দেশের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের প্রেক্ষাপটে অবস্থান করছে বলে সমালোচকরা উল্লেখ করেন।

২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রথম ক্ষমতায় এলে তার নির্বাহী আদেশগুলোর একটি ছিল সোমালিয়াসহ সাতটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ।

সে সময় ইনফান্তিনো মন্তব্য করেছিলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ কোনো দেশের বিশ্বকাপ আয়োজনের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে। তিনি বলেছিলেন, ফিফা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী দল, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের আয়োজক দেশে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা আবশ্যক; অন্যথায় বিশ্বকাপ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

২০২৩ সালে বালির গভর্নর ইসরায়েলি দলকে অবস্থানের অনুমতি না দেওয়ায় ফিফা ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সিদ্ধান্তের তুলনাও সামনে আসছে।

২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্প প্রশাসন ১২টি দেশের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভিসায় পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তালিকায় ছিল সোমালিয়া, ইরান, হাইতি ও ডিআর কঙ্গোর মতো দেশ, যাদের কয়েকটি বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল।

এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের বিশ্বকাপ ড্রয়ের মাত্র দুই দিন আগে ট্রাম্পের একটি মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। মিনেসোটায় সোমালি অভিবাসীদের একটি বড় জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে পরিচালিত অভিবাসন অভিযানের প্রসঙ্গে তিনি সোমালিয়া সম্পর্কে কঠোর মন্তব্য করেন।

ট্রাম্প বলেন, “সোমালিয়া তো দেশই না, জানেন তো। ওদের কিছুই নেই। ওরা কেবল একে অপরকে মেরে কেটে বেড়াচ্ছে। সেখানে কোনো আইন-শৃঙ্খলা বা পরিকাঠামো নেই।”

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, সোমালি অভিবাসীদের “যেখান থেকে এসেছে সেখানেই ফিরে যাওয়া উচিত” এবং “আমরা যদি এভাবেই আমাদের দেশে আবর্জনা ঢোকাতে থাকি, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভুল পথে চলে যাবে।”

এই রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রেক্ষাপটের মধ্যেই ওমর আরতানের ঘটনা সামনে এসেছে।

ফিফা জানিয়েছে, “আয়োজক দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়া বা ভিসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ফিফা জড়িত নয়।”

তবে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বকাপ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত একজন রেফারিকে ফিফা দায়িত্ব দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি যদি আয়োজক দেশে প্রবেশই করতে না পারেন, তাহলে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংস্থাটির কার্যকর ভূমিকা কী হতে পারে?

ফিফার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন

রাশিয়া ও কাতারের ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ নানা রাজনৈতিক ও মানবাধিকার বিতর্কের মুখে পড়েছিল। অনেকের ধারণা ছিল, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হয়তো তুলনামূলকভাবে কেবল ফুটবলকেন্দ্রিক একটি আয়োজন হবে। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই অভিবাসন ও প্রবেশাধিকার ইস্যু নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ফিফা বলছে, আয়োজক দেশের অভিবাসন ও ভিসা প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তবে সমালোচকদের মতে, বিশ্বকাপ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংস্থার নির্বাচিত একজন কর্মকর্তার প্রবেশ নিশ্চিত করতে না পারা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।

২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ইনফান্তিনো বলেছিলেন, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দল, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের আয়োজক দেশে প্রবেশের সুযোগ না থাকলে সেটিকে প্রকৃত অর্থে বিশ্বকাপ বলা কঠিন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সমর্থক ও কর্মকর্তাদের মধ্যেও উদ্বেগ

শুধু আরতানই নন, বিভিন্ন দেশের সমর্থক ও কর্মকর্তারাও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছেন।

ইরাকের কিছু সমর্থক জানিয়েছেন, ভিসা জটিলতার কারণে তারা বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন।

অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, মার্কিন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে তাদের গ্রুপ পর্বের টিকিট বরাদ্দ বাতিল হয়েছে। এছাড়া দলের ১৫ জন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার ভিসা নিয়েও জটিলতা রয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ মাঠের ভেতরে ফিফার নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হলেও মাঠের বাইরে অভিবাসন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশাধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আয়োজক রাষ্ট্রের হাতেই থাকে। ওমর আরতানের ঘটনাটি সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে এবং একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে – বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কার হাতে, ফিফার নাকি আয়োজক দেশের সরকারের?