ক্রাইম ক্রনিকল ডেস্ক | বরগুনা
বরগুনার পাথরঘাটা উপকূলে জেলেদের জালে ধরা পড়া একটি রহস্যময় যান্ত্রিক বস্তু ঘিরে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এটি পানির নিচে চলাচলকারী স্বয়ংক্রিয় গবেষণা যান বা অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল (AUV) হতে পারে। তবে যন্ত্রটির প্রকৃত পরিচয়, উৎস এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ মে বিকেলে পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের খলিফার হাট এলাকার একটি মাছ ধরার ট্রলার বঙ্গোপসাগরের মোহনা এলাকায় মাছ শিকারে যায়। জাল তোলার সময় জেলেরা অস্বাভাবিক ভার অনুভব করেন। প্রথমে তারা ধারণা করেছিলেন বড় কোনো সামুদ্রিক প্রাণী জালে আটকা পড়েছে। পরে জাল ওপরে তোলার পর দেখা যায়, প্রায় আট ফুট দীর্ঘ একটি যান্ত্রিক বস্তু ধরা পড়েছে।
ট্রলারের জেলে মিরাজ হোসেন বলেন, জীবনে প্রথমবারের মতো এমন বস্তু দেখেছেন তারা। যন্ত্রটির গায়ে পাখার মতো অংশ এবং ভেতরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক উপাদান থাকায় প্রথমে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ এটিকে সামরিক সরঞ্জামের অংশ বলেও সন্দেহ করেছিলেন।
পরদিন ১ জুন জেলেরা বস্তুটি পাথরঘাটা ঘাটে নিয়ে আসেন এবং স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে যন্ত্রটি নিজেদের হেফাজতে নেয়।
উদ্ধার হওয়া যন্ত্রটির বাহ্যিক গঠন টর্পেডোর মতো দীর্ঘ ও সিলিন্ডার আকৃতির। দুই প্রান্ত গোলাকার এবং পেছনের অংশে রয়েছে চলাচল ও ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ ধরনের ফিন বা পাখা। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ভেতরে ব্যাটারি ইউনিট, সেন্সর, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির বিভিন্ন উপাদান থাকার বিষয়টি নজরে এসেছে।
সামুদ্রিক প্রাণিবিজ্ঞানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি একটি অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল (AUV) বলে মনে হচ্ছে। তাঁর মতে, যান্ত্রিক ত্রুটি, শক্তির ঘাটতি বা নেভিগেশন সমস্যার কারণে এটি স্রোতের টানে বাংলাদেশের উপকূলে চলে এসে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমুদ্র গবেষণা, জলবায়ু পর্যবেক্ষণ, সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি, পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের কাজে এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘ সময় পানির নিচে অবস্থান করে এসব যান বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে সক্ষম।
তবে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে এমন কোনো ডুবোযান পরিচালনার তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ফলে এটি বিদেশি কোনো গবেষণা কার্যক্রমের অংশ হতে পারে কি না, কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছিল কি না—সেসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যন্ত্রটির সিরিয়াল নম্বর, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, সংরক্ষিত তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত উপাদান বিশ্লেষণ করা গেলে এর উৎস ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। ডেটা অক্ষত থাকলে এটি কোথা থেকে এসেছে, কতদিন সমুদ্রে ছিল এবং কী ধরনের কার্যক্রমে নিয়োজিত ছিল, সে সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।
পাথরঘাটা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ সোহান জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পাওয়ার পর যন্ত্রটি উদ্ধার করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টির প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট দিক যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপস পাল বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সামুদ্রিক গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এ ধরনের উন্নত প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান সদৃশ যন্ত্র উদ্ধারের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ফলে এটি শুধু স্থানীয় কৌতূহলের বিষয় নয়; বঙ্গোপসাগরে পরিচালিত আন্তর্জাতিক গবেষণা, সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান এবং আঞ্চলিক সামুদ্রিক কার্যক্রম নিয়েও নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
বর্তমানে রহস্যময় যন্ত্রটির উৎস, উদ্দেশ্য এবং মালিকানা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষে এর প্রকৃত পরিচয় উদঘাটিত হলে বঙ্গোপসাগরে পরিচালিত বিভিন্ন সামুদ্রিক কার্যক্রম সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।