স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর দমন–পীড়নের ধারাবাহিকতা ভেঙে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)।
সিপিজে জানায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ১০০ দিন পূর্তিকে কেন্দ্র করে সংস্থাটির এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রাম থেকে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে এ আহ্বান জানানো হয়। মঙ্গলবার (২ জুন) সিপিজের ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

সিপিজের দশ দফা আহবান যুক্ত পোস্ট। ফেসবুক থেকে নেয়া।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই বছরে বাংলাদেশে একাধিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনটি সরকার এসেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন।
সিপিজে বলছে, প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলের সময় সাংবাদিকরা গ্রেপ্তার, মামলা, নজরদারি, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে আগের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বা রাজনৈতিক অবস্থানের অভিযোগ তুলে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করে জানিয়েছে, দেশে সাংবাদিকদের অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই ও প্রোফাইল তৈরির প্রবণতা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের সমন্বয়কারী কুনাল মজুমদার বলেন, “বাংলাদেশে প্রতিটি নতুন সরকারই পূর্ববর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ বা বিরোধী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকে একটি ধারাবাহিক চর্চায় পরিণত করেছে।” তাঁর মতে, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও ১০০ দিনেও দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব সীমিত।
এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকারকে ১০ দফা সুপারিশ দিয়েছে সিপিজে। সেগুলো হলো –
১. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার বন্ধ ও পুনর্বিবেচনা: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার, একাধিক মামলার চর্চা বন্ধ এবং সাংবাদিকতার কারণে আটকদের দ্রুত জামিন ও মুক্তি নিশ্চিত করা।
২. সাইবার আইন সংস্কার ও অপব্যবহার বন্ধ: ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং মতপ্রকাশ দমনমূলক ব্যবহার বন্ধ করা।
৩. সহিংসতা ও হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত: সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হত্যার প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
৪. গণমাধ্যম নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর সংগঠিত সহিংসতা ও ভয়ভীতি বন্ধে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
৫. দমনমূলক আইন সংস্কার: সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মতো আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার বন্ধ করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সংশোধন করা।
৬. আইসিটি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা: সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ বিশেষ আদালতের অপব্যবহার বন্ধ এবং চলমান মামলা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা।
৭. গণমাধ্যম কমিশন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো পুনর্বিবেচনা: প্রস্তাবিত সম্প্রচার ও গণমাধ্যম কমিশন যেন স্বাধীনতার পরিপন্থী নিয়ন্ত্রণে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে খসড়া অধ্যাদেশ পুনর্গঠন করা।
৮. নজরদারি ও পুরোনো আইন সংস্কার: মানহানি আইন, টেলিযোগাযোগ আইনের নজরদারি বিধানসহ পুরোনো দমনমূলক আইন বাতিল বা সংশোধন করে বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করা।
৯. অ্যাক্রেডিটেশন ও এসএলএপিপি সংস্কার: সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র বাতিলের প্রক্রিয়া সংস্কার এবং হয়রানিমূলক মামলা (SLAPP) ঠেকাতে আইনি সুরক্ষা চালু করা।
১০. অপপ্রচার ও ট্যাগিং বন্ধ: সাংবাদিকদের ‘দেশদ্রোহী’, ‘বিদেশি এজেন্ট’ বা রাজনৈতিক পক্ষের লোক হিসেবে চিহ্নিত করে অপপ্রচার বন্ধ এবং সাংবাদিকতার সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
সিপিজে সতর্ক করে বলেছে, এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দমন–পীড়নের চক্র অব্যাহত থাকবে। তবে কার্যকর সংস্কার করা গেলে বাংলাদেশে একটি স্বাধীন ও নিরাপদ গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে ওঠা সম্ভব।