আখ কাটার কাজে টিকে থাকতে জরায়ু অপসারণ, মহারাষ্ট্রের কিছু গ্রাম এখন ‘জরায়ুহীন নারীদের গ্রাম’


আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল


প্রতিদিনের চা, কোমল পানীয় কিংবা চকোলেটে ব্যবহৃত চিনির পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ মানবিক সংকট। ভারতের মহারাষ্ট্রে আখশ্রমিক হিসেবে কাজ করা হাজারো দরিদ্র নারী জীবিকার তাগিদে জরায়ু অপসারণের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। শ্রম অধিকারকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, দারিদ্র্য, ঋণের বোঝা এবং অমানবিক শ্রমব্যবস্থা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।




মহারাষ্ট্রের বিড, ওসমানাবাদ, সাংলি ও সোলাপুর জেলার হাজার হাজার পরিবার প্রতিবছর আখ কাটার মৌসুমে অন্য এলাকায় পাড়ি জমান। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত টানা ছয় মাস তাঁরা আখক্ষেতে কাজ করেন। ভোরের আগে শুরু হওয়া কাজ শেষ হয় গভীর রাতে। প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। সপ্তাহে সাত দিনই কাজ চলে। অসুস্থতা বা বিশ্রামের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।


এই কঠোর শ্রমব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নারী শ্রমিকদের ওপর। মাসিকের সময় শারীরিক অসুস্থতা বা বিশ্রামের প্রয়োজন হলেও কাজ বন্ধ রাখলে মজুরি কাটা হয়, অনেক ক্ষেত্রে জরিমানাও দিতে হয়। ফলে অনেক নারী স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ করার উপায় হিসেবে হিস্টেরেকটমি বা জরায়ু অপসারণের পথ বেছে নিচ্ছেন।


মহারাষ্ট্র সরকারের স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আখ কাটার মৌসুম শুরুর আগে শুধু বিড জেলাতেই ৮৪৩ জন নারী জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৭৭ জনের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।


ভারতের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে হিস্টেরেকটমির গড় হার ৩ দশমিক ২ শতাংশ। অথচ বিড জেলার আখশ্রমিক নারীদের মধ্যে এই হার ৫৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি দুজন নারীর মধ্যে একজনেরও বেশি জরায়ু অপসারণ করিয়েছেন।




স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কিছু গ্রামে জরায়ু আছে এমন নারী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে এলাকাগুলোর কিছু অংশ এখন অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘জরায়ুহীন নারীদের গ্রাম’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।


কন্ট্রাক্টরের চাপ ও জরিমানার ভয়


আখ কাটার কাজে সাধারণত স্বামী ও স্ত্রীকে একটি ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নির্ধারিত কাজ শেষ করতে না পারলে কিংবা কোনো কারণে কাজ বন্ধ থাকলে পুরো ইউনিটকে জরিমানা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একদিন কাজ না করলে কয়েকশ রুপি পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।


শ্রমিকদের অভিযোগ, কন্ট্রাক্টরদের চাপের কারণে নারীরা মাসিককে শ্রমের পথে বাধা হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। ফলে অনেকে জরায়ু অপসারণকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মনে করছেন।


সুযোগ নিচ্ছেন অসাধু চিকিৎসকেরা


স্থানীয় সমাজকর্মীদের অভিযোগ, অনেক বেসরকারি ক্লিনিক ও চিকিৎসক সামান্য স্ত্রীরোগজনিত সমস্যার ক্ষেত্রেও জরায়ু অপসারণের পরামর্শ দেন। দরিদ্র ও অশিক্ষিত নারীদের অনেকেই অস্ত্রোপচারের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না রেখেই সিদ্ধান্ত নেন।


চিকিৎসকদের মতে, অল্প বয়সে জরায়ু অপসারণের ফলে হরমোনজনিত সমস্যা, হাড় ক্ষয়, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, মানসিক অবসাদ এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।


বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ শৃঙ্খলে সেই চিনি


আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মহারাষ্ট্রের আখক্ষেত থেকে উৎপাদিত চিনি সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে কোকা-কোলা, পেপসি, ক্যাডবেরি ও ইউনিলিভার-এর বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি আখচাষিদের কাছ থেকে চিনি সংগ্রহ করে না, তবে সংশ্লিষ্ট চিনিকল ও সরবরাহকারীদের মাধ্যমে উৎপাদিত চিনি তাদের পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ প্রকাশের পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ শৃঙ্খল পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।


কমিটি হয়েছে, বাস্তবতা বদলায়নি


বিষয়টি নিয়ে মহারাষ্ট্র সরকার একাধিকবার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। নারীস্বাস্থ্য ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে সচেতনতামূলক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সমস্যার মূল কারণ দারিদ্র্য, ঋণ, অনিরাপদ শ্রমব্যবস্থা এবং সামাজিক বৈষম্য। এসব সমস্যার সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।


ফলে প্রতি মৌসুমে হাজারো নারী একই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন।


শোষণের এক নীরব রূপ


শোষণ মানেই কারখানার ধোঁয়া, শিশুশ্রম বা শিকলবন্দি শ্রমিকের ছবি নয়। মহারাষ্ট্রের আখক্ষেতের ঘটনাগুলো দেখায়, আধুনিক শোষণ আরও নীরব এবং আরও জটিল।


এখানে কাউকে অস্ত্র দেখিয়ে বাধ্য করা হয় না। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, ঋণের চাপ এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম মানুষকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের শরীরের একটি অঙ্গ হারানোও জীবিকার অংশ হয়ে ওঠে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সমাজের উন্নয়ন শুধু অর্থনীতি বা প্রযুক্তির অগ্রগতিতে পরিমাপ করা যায় না। জীবিকার জন্য কোনো নারীকে নিজের জরায়ু অপসারণ করতে বাধ্য হতে হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরই একটি সমাজের মানবিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।