শিবিরের মালেক হত্যাকান্ড: মিথ বনাম বাস্তবতা
তুহিন খাঁন

১.

১৯৬৯ সালে ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের মৃত্যু নিয়ে জামায়াত-শিবিরের যে অফিশিয়াল ন্যারেটিভ, তা বেশ সহজ ভাষায় তুলে ধরছেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের সাবেক ভিসি প্রফেসর ডক্টর আবু বকর রফিক। তিনি সেসময় ছাত্রসংঘের কর্মী ছিলেন। গত বছর ১৪ আগস্ট নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক কলামে তিনি লেখেন: “আমার প্রতি নির্দেশ ছিল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার, কিন্তু পারিবারিক কারণে আমাকে জরুরি ভিত্তিতে বাড়ি যেতে হয়। আব্দুল মালেকের যুক্তিপূর্ণ ও তথ্যভিত্তিক বক্তব্য খণ্ডন করার সামর্থ্য তোফায়েল ও তার সাথীদের ছিল না। তারা গোপনে ছাত্র-শিক্ষক সম্মেলন কেন্দ্রে কিছু হকিস্টিক এবং ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে যায়। আব্দুল মালেক যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন, তখন তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রব গং একযোগে হইচই করে তার ওপর হামলা করে।

একপর্যায়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় রেসকোর্স ময়দানে। সেখানে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে তার মাথা থেঁতলে দেয়া হয়। আব্দুল মালেককে অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে রেখে হামলাকারীরা চলে যায়। সঙ্ঘের কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরের দিন জাতীয় দৈনিকগুলোতে তোফায়েল আহমেদ ও আব্দুর রবের হাতে হকিস্টিক ও ক্রিকেট ব্যাটের ছবিসহ আব্দুল মালেককে আঘাত করার ছবি প্রকাশিত হয়।” (‘শহীদ আব্দুল মালেকের শেষ দিনগুলো’, নয়া দিগন্ত, ১৪ আগস্ট ২০২৫)

উনি নিজেই স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন যে, সেদিন তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। আর বোধহয় সেকারণেই, প্রায় পুরা ঘটনাটাই উনি ভুলভাবে তুলে ধরছেন। কিন্তু জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা ঠিক এভাবেই ঘটনাটা বর্ণনা করে। 

২.

আসলে সেদিন কী হইছিল? তা বোঝার জন্য আমরা তিনটা সোর্স ইউজ কর‍তে পারি।

প্রথমত, আল বদর নেতা চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের ভাষ্য থেকে জানা যায়, আব্দুল মালেকের যে বক্তৃতার কথা বলা হয়, সেটা তিনি দিছিলেন এই ঘটনার সপ্তাহখানেক আগে, NIPA আয়োজিত এক বিতর্ক অনুষ্ঠানে। ডাকসুর প্রোগ্রাম ছিল ১২ আগস্ট। ওই প্রোগ্রামে ছাত্র সংঘের নেতারা গিয়ে বক্তৃতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু তাদের ‘সবর’ করতে বলা হয়।

মঈনুদ্দীনের ভাষ্যমতে, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের (সম্ভবত ভুল; মূলত শামসুদ্দোহার বক্তব্যের সময় ঘটনাটি ঘটে) বক্তৃতার সময় ‘কোরআনবিরোধী’ বক্তব্যের বিরুদ্ধে ছাত্র সংঘের নেতারা হট্টগোল ও গোলমাল শুরু করেন এবং গোলমালের প্রথম পর্যায়ে তাদের বিরোধী পক্ষ ‘হল ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।’ পরে রেসকোর্স মাঠে তারা আব্দুল মালেকসহ আরো কয়েকজনের উপরে হামলা করে।

৩.

এ ব্যাপারে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ সোর্স হইল দৈনিক আজাদ পত্রিকা। এ পত্রিকাটি তখন ডানপন্থীদের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র ছিল, এবং ১৩ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট—মোট ১৩ দিনব্যাপী তারা আব্দুল মালেকের ঘটনাটিকে কভারেজ দেয়। এরমধ্যে দুটো উপসম্পাদকীয়ও ছাপায় তারা, যার একটা লেখছিলেন তৎকালীন ছাত্র সংঘের নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দীন।

‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় দুইদল ছাত্রের মধ্যে সংঘর্ষ’ শিরোনামে আজাদ ঘটনাটার বেশ ডিটেইল বিবরণ দিছে এভাবে: “ডাকসুর উদ্যোগে...আয়োজিত এক আলোচনা সভা দুই পৃথক মতাবলম্বী ছাত্রদলের মারামারির মধ্যে দিয়া সমাপ্ত হয়। এই মারামারিতে উভয় পক্ষের অন্যূন ৫০ জন ছাত্র আহত হয়।...

...ডাকসুর সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমদের সভাপতিত্বে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সভা শুরু হয়। সভার প্রথম বক্তা জনাব শামসুদ্দোহা নয়া শিক্ষানীতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দান করিতে থাকিলে এক পর্যায়ে কিছুসংখ্যক ছাত্র একযোগে দাঁড়াইয়া পড়ে এবং বিভিন্ন ধ্বনি করিয়া বক্তার মতামতের প্রতিবাদ জানায়। এই সময় সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমদ সকলের প্রতি শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং প্রতিবাদমুখর ছাত্রদেরও বক্তব্য পেশ করার সুযোগ দানের প্রতিশ্রুতি দেন।

কিন্তু গোলযোগ ক্রমেই বাড়িতে থাকে এবং এক পর্যায়ে কিছুসংখ্যক ছাত্র দৌড়াইয়া মঞ্চে আরোহণ করিয়া মঞ্চের চেয়ার টেবিল তছনছ করিয়া দেয়। সেমিনারে উপস্থিত দর্শকগণ এই সময় দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া এদিক ওদিক ছুটাছুটি করিতে থাকে। মুহূর্ত্ত মধ্যে হলের মধ্যে বেদম চেয়ার ছোড়াছুড়ি শুরু হয় এবং এইভাবে প্রায় অর্ধঘণ্টা গোলযোগ পর উভয়পক্ষই হল ত্যাগ করিয়া বাহিরে চলিয়া আসে।

এই সময় হলের সমস্ত চেয়ার-টেবিল লণ্ড ভণ্ড অবস্থায় দেখা যায়। কয়েকটি চেয়ারে রক্তের দাগও লক্ষ্য করা যায়। এই চেয়ার নিক্ষেপের মধ্যে ঢাকায় জনৈক সাংবাদিক এবং এক ছাত্রীও সামান্য আহত হন।

এদিকে প্রতিবাদমুখর ছাত্ররা আবার বাহিরে আসিয়া চেয়ারের হাতল, ভাংগা কাঠ প্রভৃতিতে সজ্জিত হইয়া আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে এবং দ্বিতীয় বর্ষ রাজনীতির ছাত্র সুলতানের মাথা ফাটাইয়া দেয়৷ এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে অপর দল হাতের কাছে প্রাপ্ত হাতিয়ার লইয়া প্রতিবাদকারী ছাত্রদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়ে এবং তাহাদের অনেককে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মধ্যে ধরাশায়ী করিয়া ফেলে। এই পর্যায়ে প্রতিবাদকারী দল উর্ধ্বশ্বাসে রেসকোর্স ময়দানের দিকে দৌড়াইতে থাকিলে অপরপক্ষ তাহাদের তাড়াইয়া লইয়া যায় এবং অনেককে রেসকোর্স ময়দানে প্রহার করিয়া ধরাশায়ী করে প্রতিবাদকারী ছাত্ররা আত্মরক্ষার্থে রেসকোর্সের দিকে দৌড়াইবার সময়ও অনেকের মাথায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের চেয়ার পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবাদমুখর ছাত্ররা পলায়ন করিলে জনাব তোফায়েল আহমদের সভাপতিত্বে আবার আলোচনা সভা শুরু হয়।”

৪.

এই ঘটনার আরেকটু চমকপ্রদ বিবরণ দিছে পাকিস্তান অবজার্ভার। ‘Clash at Seminar: Students want Commission’ শিরোনামের নিউজে পত্রিকাটি লেখে: “Before Mr. Shamsuddoha could finish what he wanted to say, some elements shouted against secular education and rushed to the dais. They used iron rods and wooden sticks, and the tables, chairs and glasses inside the hall were heavily damaged. The students ran away in all directions, while some of them fell apart inside the room, grievously injured. After a few minutes of this, the students mobilised and launched a counterattack. This time, there was an exchange of chairs, wooden sticks and brickbats.

The rowdy elements who had launched the attack first inside the Teacher Student Centre this time found themselves surrounded by hundreds of students and thus started searching for the way to escape from the scene. Most of them ran towards the Race Course and took shelter inside the temple there.”

এছাড়া অন্যান্য পত্রিকাও প্রায় সেম নিউজ করে। দৈনিক সংবাদের শিরোনাম ছিল: ‘ডাকসু’র সেমিনারে গোলযোগ’। মর্নিং নিউজের শিরোনাম ছিল: ‘Students clash at TSC’। ডনের শিরোনাম ছিল: ‘16 students hurt in Dacca: clash between rivals’।
 

৫.

এসব নিউজ ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের স্বীকারোক্তি থেকে বোঝা যায়, জামায়াত-শিবির এ ব্যাপারে কর্মীদের মধ্যে যে ন্যারেটিভটি প্রচার করে, তা নিজেদের বানানো একটা মিথমাত্র।

প্রথমত, সেমিনারটিতে আব্দুল মালেক কোনো বক্তৃতা দেন নাই। বরং শামসুদ্দোহার বক্তৃতার সময় ছাত্র সংঘের নেতারা হট্টগোল শুরু করেন, মঞ্চে হামলা করেন, মুঈনুদ্দীনের ভাষায় বিরোধীরা একপর্যায়ে ‘হল ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়’, তারপর সংঘাত শুরু হয়। একদফা সংঘর্ষের পর বাইরে এসে ছাত্র সংঘের নেতারা আবার হামলা করে একজন ছাত্রের মাথা ফাটিয়ে দেয়, এবং তারপর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে রেসকোর্সের ঘটনা ঘটে।

দ্বিতীয়ত, আব্দুল মালেককে আলাদাভাবে টার্গেট করে হলের মধ্যেই সবাই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, এবং তারে রেসকোর্সে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়—এই ন্যারেটিভও, এসব নিউজের আলোকে, একদমই সত্য নয়। বরং দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মর্মান্তিক বলি হন আব্দুল মালেক। এবং দুই পক্ষেরই আরো অনেকে, অন্তত ৫০ জন, আহত হন।

তৃতীয়ত, আজাদের খবরে দেখা যাচ্ছে, হট্টগোলরত শিক্ষার্থীরা বাইরে চলে যাওয়ার পর তোফায়েলের সভাপতিত্বে আবার সেমিনার শুরু হয়। অর্থাৎ, তোফায়েল রেসকোর্সের ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। চৌধুরী মুঈনুদ্দীনও এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

চতুর্থত, এ ঘটনার পরে একটি মামলা হয়। মামলার আসামীদের কোনো লিস্টে তোফায়েল আহমদের নাম নাই। ১৯৯৬ সালে যখন লীগ ও জামায়াত যুগপৎ আন্দোলনে ছিল, তখন তোফায়েল আহমদ ছিলেন ওই লিয়াজো কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কাদের মোল্লার সন্তানের ভাষ্যমতে, সরকারের গ্রেফতারি থেকে বাঁচতে কাদের মোল্লা ও তোফায়েল আহমদ একত্রে আত্মগোপনে ছিলেন। আগে-পরে কখনোই জামায়াত আব্দুল মালেকের হত্যাকাণ্ডের জন্য তোফায়েলকে অভিযুক্ত করে বিচার চায় নাই।

৬.

আব্দুল মালেক গরিব ঘরের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তার মৃত্যুতে ডাকসু, ঢাবি কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক সমিতি, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, শেখ মুজিবুর রহমানসহ প্রায় সকল দলমতের লোকেরা শোক প্রকাশ করে। তবে তৎকালীন সামরিক সরকার তার মৃত্যুতে কোনো শোকবার্তা দিছিল কিনা, তা জানা যায় না। অন্তত পত্র-পত্রিকাগুলোতে সরকারের তরফে কোনো শোকবার্তার খবর পাই নাই। অথচ আব্দুল মালেক ওই সামরিক সরকারের প্রণীত ‘ইসলামি’ শিক্ষানীতির পক্ষেই লড়াই করে যাচ্ছিলেন।

পশ্চিম পাকিস্তানের নিউজপেপারগুলা ঘাঁটলে দেখা যায়, মালেকের ঘটনা সেখানকার রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক স্ফিয়ারে তেমন কোনো গুরুত্বই পায় নাই। এমনকি তৎকালীন সরকার এই ঘটনার কোনো বিচার বা ইনকোয়ারিও করছে কিনা, করলে তাদের সাজা কী হইছে, তারও কোনো পাবলিক রেকর্ড নাই।