ক্রাইম ক্রনিকল এক্সপ্লেইনড
একটি সাধারণ কাঠের পেনসিল দিয়ে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য দাগ টানি, কিন্তু এর শরীরের প্রতিটি উপাদানের পেছনে লুকিয়ে আছে আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে জটিল ও বিতর্কিত এক বৈশ্বিক সমীকরণ।
নোবেলজয়ী মুক্তবাজারপন্থী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান তাঁর কালজয়ী ‘ফ্রি টু চুজ’ টেলিভিশন সিরিজে লিওনার্ড রিডের ১৯৫৮ সালের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘আই, পেনসিল’ (I, Pencil)-এর একটি চমৎকার রূপক তুলে ধরেছিলেন।
ফ্রিডম্যান দেখিয়েছিলেন, পেনসিলের দেবদারু কাঠ আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন থেকে, এর ভেতরের গ্রাফাইট বা শিস খোদাই করা হয় শ্রীলঙ্কা থেকে, মাথার রবার বা ইরেজার আসে মালয়েশিয়ার বাগান থেকে, আর সেই রবারকে কাঠের সাথে আটকে রাখার পিতলের ক্লিপটি তৈরি হয় লুইজিয়ানার কারখানায়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই বিশাল উৎপাদন প্রক্রিয়ার পেছনে কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশক, কোনো স্বৈরশাসক বা কোনো একক ‘মাস্টার মাইন্ড’ বসে কাজ পরিচালনা করেনি।
ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ধর্ম এবং ভিন্ন সংস্কৃতির হাজার হাজার মানুষ, যারা হয়তো একে অপরের অস্তিত্ব সম্পর্কেও সচেতন নয়, তারা কেবল মুক্তবাজারের ‘দাম ব্যবস্থার’ (Price System) নৈর্ব্যক্তিক ইশারায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই পণ্যটি তৈরিতে অংশ নিয়েছে।
ফ্রিডম্যানের মতে, বাজার অর্থনীতির এই জাদুকরী শক্তি কোনো বলপ্রয়োগ ছাড়াই মানুষকে এক সুতোয় গাঁথে, যা বৈশ্বিক সম্প্রীতি ও শান্তির এক অনন্য দলিল।
তবে অপরাধ ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক গবেষকেরা ফ্রিডম্যানের এই মসৃণ আখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম নিষ্ঠুরতা ও কাঠামোগত অপরাধের ইতিহাসকে সামনে এনেছেন।
সমালোচকেরা যুক্তি দিচ্ছেন, ফ্রিডম্যানের বর্ণিত এই ‘শান্তিময় সমন্বয়’ আসলে কোনো প্রাকৃতিক বা স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা নয়, বরং এটি শত বছরের ঔপনিবেশিক জবরদখল, সামরিক শক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
পেনসিলের যে রবার আমদানির কথা বলা হয়েছে, তার পেছনের সত্যটি হলো—ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা ব্রাজিলের আমাজন থেকে চুরির মাধ্যমে রবারের বীজ এনে মালয়েশিয়ায় রোপণ করেছিল এবং সেখানে নামমাত্র মূল্যে চুক্তিবদ্ধ দাস বা অভিবাসী শ্রমিকদের হাড়ভাঙা খাটুনি ও রক্তে সেই সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। একইভাবে, দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা এশিয়ার খনিগুলো থেকে যে গ্রাফাইট তোলা হয়, তার ইতিহাসও শিশুশ্রম, বন্দিশ্রম এবং পরিবেশ ধ্বংসের অপরাধে কলঙ্কিত।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ। ছবি: এআই নির্মিত।
পুঁজিবাদের এই তথাকথিত ‘অদৃশ্য হাত’ আসলে বহুলাংশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দৃশ্যমান লাঠি এবং আন্তর্জাতিক আইনি ফাঁকফোকরের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের শ্রম সস্তায় কিনে নেওয়ার এক সুকৌশলী অপরাধমূলক বন্দোবস্ত। ফলে, ফ্রিডম্যান যে নৈর্ব্যক্তিক দাম ব্যবস্থাকে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে উদযাপন করেছিলেন, তা আজ বিশ্ব সচেতন মহলে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বৈশ্বিক শোষণের এক নির্মম উদাহরণ হিসেবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যবচ্ছেদ হচ্ছে।