স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল এলাকায় অসহায় রোগী ও লাশের স্বজনদের জিম্মি করে রাখা ‘অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট’ এর বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন চীফ মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী খবরের ওপর ভিত্তি করে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (Suo Moto) এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম)।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এজিএম মনিরুল হাসান সরকার গত সোমবার (৮ জুন) এক বিশেষ আদেশের মাধ্যমে চমেক হাসপাতাল এলাকার অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দীর্ঘদিনের দৌরাত্ম্য ও চাঁদাবাজি চিরতরে বন্ধে এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন।
আদেশে বলা হয়, চমেক হাসপাতাল এলাকায় বাইরে থেকে আসা বৈধ অ্যাম্বুলেন্স কিংবা স্বজনদের নিজস্ব গাড়িতে রোগী বা মরদেহ পরিবহনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি চক্র বাইরের গাড়িচালকদের হুমকি, মারধর ও হয়রানি করছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওচিত্র ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসা লোমহর্ষক সব অভিযোগের ভিত্তিতে সিএমএম ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC), ১৮৯৮ এর ২৫ ধারার অধীনে প্রদত্ত ‘জাস্টিস অব দ্য পিস’ (Justice of the Peace) এখতিয়ার প্রয়োগ করেছেন। এই বিশেষ ধারার আওতায় একজন বিচারক যেকোনো গুরুতর সামাজিক বা পাবলিক অপরাধ দমনে সরাসরি পুলিশকে তাৎক্ষণিক অ্যাকশন নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।
চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. গিয়াস উদ্দীন চৌধুরী এই বিশেষ আদেশের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এই আদেশ সাধারণ মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি বড় মাইলফলক।
বিজ্ঞ সিএমএমের আদেশে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উত্তর বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনারকে (এডিসি) সরেজমিনে ঘটনাস্থল তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) যুক্ত করে আদেশে ৫টি সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
১. সিন্ডিকেট হোতাদের শনাক্তকরণ ও এফআইআর দায়ের: চমেক হাসপাতালের সামনে বৈধ গাড়ি প্রবেশে বাধা দেওয়া চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিললে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, বেআইনি বাধা দেওয়াসহ বিভিন্ন ধারা এবং সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী এজাহার (এফআইআর) দায়ের করতে হবে।
২. ভাড়ার তালিকা প্রকাশ: সিন্ডিকেটের অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে অ্যাম্বুলেন্সের নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে প্রকাশ্যে প্রদর্শন বা টাঙিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. মুক্ত পরিবহনের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিতকরণ: চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রোগী ও মৃত ব্যক্তির স্বজনেরা কোনো বাধা ছাড়াই নিজেদের পছন্দমতো অ্যাম্বুলেন্স, ফ্রিজিং ভ্যান বা নিজস্ব যানবাহন ব্যবহার করতে পারেন।
৪. হেনস্তা ও মারধর বন্ধ: হাসপাতালের বাইরে থেকে আসা কোনো বৈধ অ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী গাড়ির চালকদের হুমকি, মারধর ও হেনস্তা করা হলে অপরাধীদের তাৎক্ষণিক গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৫. সাত দিনের ডেডলাইন:এই আদেশের আলোকে কী কী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো, তা আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে ‘কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ (অগ্রগতি প্রতিবেদন) আকারে বিজ্ঞ সিএমএম আদালতে দাখিল করার জন্য সিএমপির এডিসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের এই সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, ‘জাস্টিস অব দ্য পিস’ ক্ষমতার এমন প্রায়োগিক ব্যবহার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা খাতের নানামুখী সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা করতে দেশের অন্যান্য আদালতের জন্যও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আদালতের এই কঠোর অবস্থানের পর সাধারণ মানুষ চমেক হাসপাতালে সিন্ডিকেটের জিম্মিদশা থেকে দ্রুত মুক্তি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।