ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রশাসনের প্রভাবশালী ও ঘনিষ্ঠজনদের উদ্যোগে মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে আলোচনায় এসেছে একটি নতুন ধারণা—‘বোর্ড অব পিস’ (Board of Peace)। গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং ফিলিস্তিন পুনর্গঠনের নামে এই পরিষদ গঠনের কথা বলা হলেও, এর উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে শুরুতেই বড় ধরনের বিতর্ক ও রহস্য তৈরি হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এর উদ্দেশ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া তদারকি করা হলেও এর প্রকৃত লক্ষ্য ভিন্ন। মূলত হামাসকে সম্পূর্ণ ক্ষমতার বাইরে রেখে গাজায় একটি ইসরায়েল-বান্ধব বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করা এবং আরব দেশগুলোর অর্থায়নে সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই এই পরিষদের মূল উদ্দেশ্য।

এই পরিষদের পেছনে রয়েছেন ট্রাম্পের অতি বিশ্বস্ত এবং ডানপন্থী ব্যবসায়ী ও নীতি-নির্ধারকদের একটি শক্তিশালী বলয়। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, যিনি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের স্থপতি, এবং সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ট্রাম্পের তহবিল জোগাড়কারী শীর্ষস্থানীয় আবাসন ব্যবসায়ীরা এই পরিকল্পনার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন, যাদের সাথে ইসরায়েলের কট্টরপন্থী লবিস্টদের সরাসরি সংযোগ রয়েছে।

তবে এই পরিষদের ধারণাকে শুরুতেই সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। সংগঠনটি একে ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি "নব্য-উপনিবেশবাদী প্রকল্প" হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং স্পষ্ট জানিয়েছে যে, গাজার ভবিষ্যৎ কী হবে তা কেবল ফিলিস্তিনিরাই নির্ধারণ করবে; কোনো বিদেশি বা ট্রাম্পের ব্যবসায়ী বন্ধুদের তৈরি করা ‘বোর্ড’ গাজাবাসী মেনে নেবে না।

শান্তি আলোচনার আড়ালে এই পরিষদের মূল লক্ষ্য আসলে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়। বিশেষ করে গাজার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলে বিলাসবহুল আবাসন ও পর্যটন খাতের বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো ট্রাম্পের ব্যবসায়ী বলয়ের অন্যতম গোপন লক্ষ্য। একই সাথে মার্কিন প্রশাসন এই পরিষদের মাধ্যমে ধনী আরব দেশগুলোকে গাজা পুনর্গঠনের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিতে বাধ্য করতে চায়, যাতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নিজস্ব তহবিল থেকে টাকা খরচ করতে না হয়। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, এই পরিষদের সদস্যপদ এবং এর নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে পর্দার আড়ালে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন ও লবিং কাজ করছে। কারা পুনর্গঠনের বড় বড় ঠিকাদারি বা কন্ট্রাক্ট পাবে, তা মূলত এই পরিষদের সদস্যপদ এবং মার্কিন প্রশাসনের সাথে আর্থিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের গভীরতার ওপর নির্ভর করছে।

কাগজে-কলমে বড় বড় পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে এই উদ্যোগের আর্থিক তহবিল বা কোষাগার প্রায় শূন্য। গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং কোনো আইনি ও রাজনৈতিক নিশ্চয়তা না থাকায় আন্তর্জাতিক দাতা ও বড় কোম্পানিগুলো অর্থ লগ্নি করতে ভয় পাচ্ছে। পাশাপাশি সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট রূপরেখা এবং স্থায়ী শান্তি ছাড়া তারা গাজা পুনর্গঠনে কোনো টাকা দেবে না।
ফলে বিনিয়োগকারীদের অনীহা ও আরব বিশ্বের অস্বীকৃতির কারণে এর কোষাগার আপাতত ফাঁকা পড়ে আছে।
বাস্তবতার নিরিখে বর্তমানে ‘বোর্ড অব পিস’ কোনো কার্যকর সংস্থা নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা বা খসড়া প্রস্তাব স্তরেই আটকে আছে। ফিলিস্তিনি জনগণের স্থানীয় সমর্থন এবং হামাসের মতো প্রতিরোধ দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া গাজায় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।
আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সংস্থাসমূহকে এড়িয়ে কেবল মার্কিন-ইসরায়েলি ব্যবসায়ী বলয় দিয়ে এত বড় মানবিক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা যাবে না। ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধীনতা স্বীকার না করে এ ধরনের বাণিজ্যিক বোর্ড দিয়ে গাজার পুনর্গঠন বা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।