নিজস্ব প্রতিবেদক | সাভার
সাভারের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী শামীম রেজাকে গ্রেপ্তারে যখন পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে অভিযান চালাচ্ছিলেন, তখনই তার সঙ্গে সাভার মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলির গোপন বৈঠকের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, শামীম রেজার কাছ থেকে নিয়মিত ইয়াবা সরবরাহ, মাসোহারা গ্রহণ এবং মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে একের পর এক পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার ও সংযুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২২ মে। সেদিন সাভারের পশ্চিম রাজাশন এলাকায় মাদক সিন্ডিকেট নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন দেশ টিভির সিনিয়র রিপোর্টার তায়েফুর রহমান তুহিন, এসএ টিভির সাভার প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেন, ক্যামেরাপারসন কাইয়ুম ও গাড়িচালক জয়নাল। হামলাকারীরা সংবাদকর্মীদের মারধর করার পাশাপাশি তাদের বহনকারী গাড়ি ভাঙচুর এবং ক্যামেরা লুট করে বলে অভিযোগ ওঠে।
ওই রাতেই দেশ টিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক (সিএনই) মো. ফখরুল ইসলাম মজুমদার বাদী হয়ে শামীম রেজাকে প্রধান আসামি করে ২১ জনের নাম উল্লেখ এবং ৪০ থেকে ৫০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় মামলা করেন। ঘটনার পর সাংবাদিক সংগঠনগুলো জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানায়। বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)সহ বিভিন্ন সংগঠনের চাপের মুখে পুলিশও অভিযান জোরদার করে।
মামলার পর গণমাধ্যমের সামনে সাভার মডেল থানার তৎকালীন ওসি আরমান আলি ঘোষণা দেন, যেকোনো মূল্যে শামীম রেজা ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হবে। কিন্তু তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, একই রাতে গভীর রাতে শামীম রেজা থানা কম্পাউন্ডে প্রবেশ করে ওসির সরকারি বাসভবনে যান। সেখানে রাত ২টার পর প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেন তিনি। এরপর সেখান থেকে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। অথচ ওই সময়ই তাকে ধরতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছিল।
এনটিভি অনলাইনের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, সাভারের মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে কয়েকজন পুলিশ সদস্যের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, শামীম রেজার মাদক ব্যবসা থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হতো এবং কিছু পুলিশ সদস্য তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। এমনকি জিজ্ঞাসাবাদে শামীম দাবি করেছেন, তার নিয়ন্ত্রিত মাদকের আখড়া থেকে তৎকালীন ওসির জন্য নিয়মিত ইয়াবা সরবরাহ করা হতো। যদিও এ অভিযোগের সত্যতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।
শামীম রেজার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার পাশাপাশি পুলিশের ওপর হামলা, অস্ত্র মামলা, ভুয়া পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতিসহ অন্তত ১১টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার মাদক সিন্ডিকেট নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন এসএ টিভির প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেন। এর আগে র্যাব শামীমের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও মাদকসহ কয়েকজন সহযোগীকে আটক করলেও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
ঘটনার চার দিনের মাথায়, ২৬ মে, সাভার মডেল থানার ওসি আরমান আলিকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে শামীম রেজার সঙ্গে যোগাযোগ ও সখ্যতার অভিযোগে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনিরুজ্জামান, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশিফুর রহমান ও মেরাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ১৫ জুন থানার পরিদর্শক (অপারেশন) হেলাল উদ্দিনকেও পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। একের পর এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের ভেতরেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
এদিকে শামীম রেজাকে গ্রেপ্তারের অভিযান নিজেই তদারকি করেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, শামীম মোবাইল ফোন ব্যবহার না করায় তার অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে তার এক সহযোগীকে অনুসরণ করতে গিয়ে কক্সবাজারে অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। এক পর্যায়ে নভোএয়ারের কক্সবাজার-ঢাকা ফ্লাইটের একটি পিএনআর বার্তার সূত্র ধরে গত ১০ জুন সকালে কক্সবাজার বিমানবন্দর এলাকা থেকে দুই সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাকে ঢাকায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আয়েশা সিদ্দিকার আদালত তার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মাদক সিন্ডিকেট, মাসোহারা বাণিজ্য এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে নানা তথ্য দিয়েছেন বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, “জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ওসির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে যে অভিযোগ এসেছে, তা তদন্তাধীন। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাবেক ওসি আরমান আলি। তিনি বলেন, “শামীম দেখতে কেমন, সেটাই আমি জানি না। শামীম আমার বাসভবনে গিয়েছিল—এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। এসব তথ্য কোথা থেকে আসছে, সেটিও প্রশ্নের বিষয়। তদন্তে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।”
আরেক প্রশ্নের জবাবে আরমান আলি বলেন, “প্রতিটি অফিসারকে আমি ডিফেন্ড করার চেষ্টা করতাম। এখন মনে হচ্ছে আমি ভুল মানুষদের ডিফেন্ড করেছি।”
বর্তমানে এ ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, শামীম রেজার মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন এবং পুলিশ প্রশাসনের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট চিত্র সামনে আসবে।