নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল


বাংলাদেশের বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে বলেই ‘মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত’ নামক একমুখী হত্যাযজ্ঞ চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যপ্রাণীরা আগ্রাসী হয়ে মানুষের এলাকায় ঢুকছে না; বরং তাদের আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্যসংকট ও চলাচলের পথ বন্ধ হওয়ায় তারা বাধ্য হচ্ছে মানববসতির কাছাকাছি আসতে।


শেরপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক হাতির মৃত্যু, কক্সবাজারের রামুতে চোখে গুলি খেয়ে মা হাতির করুণ মৃত্যু, রাঙ্গামাটিতে মৃত হাতির পা ও শুঁড় কর্তন কিংবা মৌলভীবাজারে অজগর সাপকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা—এসব নিঃসঙ্গ দৃষ্টান্ত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণ নীতি ও আইন বলবৎকরণের পূর্ণ ব্যর্থতার প্রতিফলন।



সম্প্রতি রাঙ্গামাটিতে মারা যাওয়া পুরুষ হাতিটি। ছবি: সমীর মল্লিক।


গত কয়েক বছরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, গুলি, বিষপ্রয়োগ ও ট্রেনের ধাক্কায় কয়েক ডজন হাতি প্রাণ হারিয়েছে। ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২’-এ হাতি হত্যা অ-জামিনযোগ্য ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও কার্যত তা কাগজেই সীমিত। ‘প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯’-এরও একই অবস্থা।


বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষা ও গণসচেতনতার অভাবে বন্যপ্রাণীকে ‘শত্রু’ কিংবা ‘প্রতিযোগী’ ভাবার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশ যেমন আলোচনায় সোচ্চার, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও সহাবস্থানের বিষয়টি তেমনি আলোচনার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে আইন থাকলেও প্রয়োগ না থাকায় জরিমানা বা শাস্তির ভীতি কার্যত অনুপস্থিত।



বন্য হাতি থেকে ফসল বাঁচাতে স্থানীয়দের আগুন ও অন্যান্য কৌশলের মাধ্যমে হাতিদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করার চেষ্টা। ছবি: মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ।


সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা তিনটি জরুরি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন -


১. বন্যপ্রাণীর অবাধ চলাচলের করিডোর সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার

২. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ

৩. বন বিভাগের জনবল ও সক্ষমতা বাড়ানো এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা


‘মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত’ একটি ভুল শব্দবন্ধ। মানুষের লোভ ও উদাসীনতার সঙ্গে টিকে থাকার অধিকারের লড়াইয়ে রয়েছে প্রকৃত সংঘাত। যত দিন না সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তত দিন এই নিধন চলতেই থাকবে।