ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হল ইউনিট শিবির নেতাদের বিরুদ্ধে হল ডিবেটিং ক্লাব ও বাধনের মতো সংগঠন বেআইনিভাবে দখল করে রাখার সুস্পষ্ট অভিযোগ উঠেছে। শিবির নেতৃবৃন্দ হল শিবিরের সভাপতি থাকা সত্ত্বেও তা প্রকাশ না করে ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়ে পরবর্তীতে শিবিরের প্যানেল থেকে ডাকসু হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচন করার প্রবণতা দেখা গেছে, যা গঠনতন্ত্রের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ডিবেটিং ক্লাবের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক পদে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা ক্লাবের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হতে পারেন না। তবে এই বিধান অমান্য করে কয়েকজন ছাত্রশিবির-সংশ্লিষ্ট নেতা ডিবেটিং ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।


অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকে ছাত্রশিবিরের হল ও বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে ছিলেন, সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পরবর্তীতে  ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব পালনকালে শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে হল সংসদ নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করেছেন।


অভিযোগ উঠেছে জিয়াউর রহমান হল ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি মো. নাঈমুল আবরার এবং সূর্যসেন হলের বিতর্ক সংগঠন ‘সূর্যসেন বিতর্ক ধারা’র সাবেক সভাপতি ও সূর্যসেন হল সংসদের জিএস মোখলেছুর রহমান জাবিরের বিরুদ্ধে।


তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ জুলাই মো. নাঈমুল আবরার জিয়াউর রহমান হল ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি হিসেবে মনোনীত হন। অভিযোগ রয়েছে, সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হল সংসদ নির্বাচনে তিনি শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে জিয়াউর রহমান হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং ৩৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।


উল্লেখ্য, জিয়াউর রহমান হল ডিবেটিং ক্লাবের গঠনতন্ত্রের ধারা ১০(২)(ছ)-এ স্পষ্ট উল্লেখ আছে, কোনো রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক পদে সম্পৃক্ত ব্যক্তি সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অথবা ইংলিশ কনভেনর পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না।



জিয়া হল ডিবেটিং ক্লাব গঠনতন্ত্রের প্রাসঙ্গিক ধারা ১০(২)(ছ) অনুযায়ী রাজনৈতিক পদে সম্পৃক্ত ব্যক্তি সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অথবা ইংলিশ কনভেনর পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না।


এ বিষয়ে জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী খালিদ আল ফাহিম বলেন, “ছাত্রশিবির তাদের হল কমিটি প্রকাশ না করে বিভিন্ন ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ক্লাবের পদে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে হল সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা প্রভাব বিস্তার করেছে। মো. নাঈমুল আবরার জিয়া হল শিবিরের সভাপতি থাকা সত্ত্বেও তা প্রকাশ না করে ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি হন এবং পরবর্তীতে ডাকসু হল সংসদের সহ-সভাপতি পদে নির্বাচন করেন, যা গঠনতন্ত্রের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”


অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতির দায়িত্বে থাকা অবস্থাতেও নাঈমুল আবরার জিয়া হল ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি তিনি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেসব কার্যক্রম প্রচার করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।



বাম পাশের ছবিতে ডান থেকে দ্বিতীয় জিয়া হল ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি নাইমুল আবরারকে শিবিরের ক্যালেন্ডার বিতরণ করতে দেখা যাচ্ছে ছবি নাইমুল আবরারের ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত 


একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে সূর্যসেন হলের ছাত্রনেতা মোখলেছুর রহমান জাবিরের বিরুদ্ধেও। তিনি ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত ‘সূর্যসেন বিতর্ক ধারা’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।



ছবি মোখলেসুর জাবিরের ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত  


অভিযোগ, সভাপতি থাকাকালেই তিনি ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়া ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হল সংসদ নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে সূর্যসেন হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, ২০২৬ সালের ৫ মার্চ নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি নিজেকে শিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সময়ে তিনি সূর্যসেন বিতর্ক ধারার সভাপতির দায়িত্বেও বহাল ছিলেন। অভিযোগ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ছাত্রশিবিরের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচারণায়ও অংশ নিয়েছেন।


এ বিষয়ে সূর্যসেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল ওয়াজেদ বলেন, “জাবির সূর্যসেন হল ছাত্রশিবিরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদকীয় পদে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সূর্যসেন বিতর্ক ধারার সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে সভাপতির দায়িত্বে থেকেই হল সংসদ নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে অংশ নেন। এমনকি নিজেকে শিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পরও তিনি সভাপতির পদে বহাল ছিলেন, যা গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”


শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, ছাত্রশিবির তাদের হল কমিটি প্রকাশ না করায় সংগঠনটির বহু হল সভাপতি ও সম্পাদকীয় পর্যায়ের নেতা বিশ্ববিদ্যালয় ও হলভিত্তিক বিভিন্ন ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ পদে অবস্থান করছেন, অথচ তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ্যে আসছে না।


সূর্যসেন হলের আরেক আবাসিক শিক্ষার্থী সৌরভ বলেন, “রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার পরও নিজেদের অরাজনৈতিক হিসেবে উপস্থাপন করার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”


তিনি আরও বলেন, ছাত্রশিবির দ্রুত তাদের হল কমিটি প্রকাশ করলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান বিভ্রান্তি ও আস্থাহীনতার অবসান ঘটবে।