নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম।

২৬ মে, ২০২৬


চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় গভীর রাতে এক দুঃসাহসিক ও পরিকল্পিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রোববার দিবাগত রাত দুইটার দিকে স্থানীয় সশস্ত্র ‘ইয়াসিন বাহিনী’র সদস্যরা র‍্যাব ও পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্পে অতর্কিতে গুলি চালায় এবং বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্পের দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত ফোর্স যাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে, সেই লক্ষ্যে সন্ত্রাসীরা জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশপথের অন্তত তিনটি স্থানে সড়ক ও কালভার্ট কেটে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তবে নানা প্রতিকূলতা ও বাধা পেরিয়ে রাতেই যৌথ বাহিনী সেখানে অভিযান পরিচালনা করে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে।


র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা ক্যাম্প লক্ষ্য করে ভারী গুলি ছুড়তে থাকে। এ সময় ক্যাম্পে থাকা র‍্যাব সদস্যরাও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়েন। একপর্যায়ে অতিরিক্ত ফোর্সের আগমন ঠেকাতে সন্ত্রাসীরা কালভার্ট ও রাস্তা কেটে দেয়।


অভিযানে অংশ নেওয়া র‍্যাব কর্মকর্তা কামাল হোসেন সোমবার ভোরে নিজের ফেসবুক আইডিতে বেশ কয়েকটি ভিডিও আপলোড করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, জঙ্গল সলিমপুরের রাস্তার বিভিন্ন অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়,

"আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য এখানে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট এবং রাস্তা কেটে দিয়েছে। ওরা মনে করেছিল যে ওদের কৌশলের কাছে আমরা পরাজিত হয়ে যাব। কিন্তু আমরা যে ওদের থেকে আরও বেশি কৌশলী, সেটা ওরা বুঝতে পারেনি।"


র‍্যাব কর্মকর্তারা জানান, রাস্তা কেটে ফেলায় গাড়ি নিয়ে সরাসরি ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত গাড়িতে গিয়ে, বাকি পথ পায়ে হেঁটে গিয়ে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করা হয়। র‍্যাবের তীব্র প্রতিরোধের মুখে একপর্যায়ে কিছু সন্ত্রাসী পালিয়ে গেলেও কয়েকজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়।


চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক (লিংক রোড) সংলগ্ন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত পাশের পাহাড়ের ভেতরেই এই জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। মূলত ‘ছিন্নমূল’ ও ‘আলীনগর’—এই দুই ভাগে বিভক্ত এলাকাটিতে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি ও বনভূমি রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই বিশাল পাহাড়ি অঞ্চলটি বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এলাকাবাসীর তথ্যমতে, জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকাটি 'রোকন বাহিনী' এবং আলীনগর এলাকাটি 'ইয়াসিন বাহিনী'র দখলে ছিল। এর আগে ২০১৭ এবং ২০২২ সালে প্রশাসন এই এলাকাটি অপরাধমুক্ত ও উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের বাধার মুখে ব্যর্থ হয়।


চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয় র‍্যাব-৭-এর একটি দল। ওই হামলায় র‍্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন এবং তিনজনকে জিম্মি করে মারধর করা হয়।

এই ঘটনার পর গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের এক বিশাল যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। সেই অভিযানে দীর্ঘ কয়েক দশক পর জঙ্গল সলিমপুরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রশাসন। উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি এবং গ্রেপ্তার করা হয় ২২ জনকে।

যৌথ অভিযানের পর সরকার এই এলাকায় পুলিশ ও র‍্যাবের জন্য দুটি স্থায়ী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দেয়। এরই অংশ হিসেবে আলীনগরে র‍্যাবের একটি ক্যাম্প তৈরির কাজ চলছিল, যা গতকাল রাতে সন্ত্রাসীরা গুঁড়িয়ে দেয়।


গত মার্চের মেগা অভিযানে ২২ জন গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা এখনো রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিনসহ মশিউর রহমান, নুরুল হক ভান্ডারি, গাজী সাদেক এবং গোলাম গফুরের মতো চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখনো পলাতক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, পলাতক এই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বেই পুনরায় এলাকাটি দখলে নিতে এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।