স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল


জাতীয় সংসদে লোডশেডিং, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু এবং গ্যাস সংকট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। এ সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের একটি মন্তব্য সংসদে হাস্যরসের জন্ম দিলেও পরে তা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।


রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন সংসদ সদস্য গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা, শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট, বিদ্যুতের ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো এবং গ্যাস সরবরাহের সমস্যার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।



সংসদে বিদুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ড. ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু 


এক পর্যায়ে এক সংসদ সদস্য গত দুই মাসে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ১০ থেকে ১১ জনের মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, বৈদ্যুতিক তারের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। একই সঙ্গে তিনি গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের অভিযোগও তোলেন।


জবাবে মন্ত্রী বলেন, “উনি বললেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মানুষ মারা গেছে। আবার উনি বললেন লোডশেডিং হচ্ছে। তো বিদ্যুৎ থাকে বলেই তো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। তাইলে লোডশেডিং আসলো কোথা থেকে?” তাঁর এ বক্তব্যের পর সরকারি দলের কয়েকজন সংসদ সদস্যকে হাসাহাসি করতে দেখা যায়।


অধিবেশনে যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রছুল নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুতের অভাবে কলকারখানা বন্ধ থাকার অভিযোগ তুলে জানতে চান, ওই এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী দাবি করেন, দেশে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই এবং লোডশেডিংও নেই। তবে সম্পূরক প্রশ্নে গোলাম রছুল বলেন, গ্রামাঞ্চলে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাঁর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।


স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিদ্যুতের ঘাটতির বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, “আগেও বলেছি, আবারও বলছি, বিদ্যুতের ঘাটতি নেই। লোডশেডিং নেই। ঝড়-বৃষ্টিতে গাছ পড়ে গেলে বা লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হয়।”


এ সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, “লোডশেডিং বলি আর মেরামতজনিত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতাই বলি, বাস্তবতা হলো গ্রামাঞ্চলের মানুষ ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পায় না।”


তিনি সংসদে দেওয়া মন্ত্রীর আগের একটি প্রতিশ্রুতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। রুমিন ফারহানা বলেন, আশুগঞ্জ সার কারখানায় ১ মে থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।


জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশে গ্যাস সংকট রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখতে গ্যাস ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। ফলে সার কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।


এ পর্যায়ে স্পিকার মন্ত্রীকে সংসদে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আপনি কিন্তু সংসদে বলেছিলেন, ১ মে থেকে গ্যাস যাবে। ভবিষ্যতে সংসদে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে বিষয়গুলো ভালোভাবে পর্যালোচনা করে নেবেন।”


সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। মন্ত্রীর দাবি, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের ঘাটতি নেই। তবে তিনি স্বীকার করেন, প্রাথমিক জ্বালানির সীমাবদ্ধতা, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, রক্ষণাবেক্ষণ কাজ এবং ঝড়-বৃষ্টির কারণে মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়।


মন্ত্রী বলেন, “লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট এক বিষয় নয়। ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ না থাকাকে লোডশেডিং বলা হয়। আর কারিগরি ত্রুটি বা প্রাকৃতিক কারণে সাময়িক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া হলো বিদ্যুৎ বিভ্রাট।”


তিনি আরও জানান, দেশে বর্তমানে ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে।


তবে সংসদে বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যদের বক্তব্যে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। তাঁদের দাবি, দেশের অনেক গ্রামীণ এলাকায় এখনও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না, শিল্পাঞ্চলেও বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।


বিদ্যুৎ আছে কি নেই, লোডশেডিং নাকি বিভ্রাট—এসব সংজ্ঞাগত বিতর্কের মধ্যেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এবং জ্বালানি খাতের বাস্তব পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত সংসদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।