আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) একটি খসড়া প্রকাশ্যে এসেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। ফাঁস হওয়া ১৪ দফার এই খসড়ায় দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের অবসান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে।

তবে নথিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সিএনএন জানিয়েছে, তারা এক মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে খসড়ার একটি অনুলিপি পেয়েছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে উপস্থিত এক কূটনীতিকসহ আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রও নথিটির বিষয়বস্তু নিশ্চিত করেছে।

যদিও চূড়ান্ত চুক্তি আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে স্বাক্ষর হওয়ার কথা, তবুও খসড়ার ভাষা ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে শেষ মুহূর্তে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র অবশ্য দাবি করেছেন, প্রকাশিত খসড়াটি চূড়ান্ত সমঝোতা স্মারকের প্রকৃত পাঠ নয়। অন্যদিকে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমও ফাঁস হওয়া সংস্করণগুলোকে পুরোপুরি নির্ভুল নয় বলে উল্লেখ করেছে।



সোমবার তেহরানে ইরানি পতাকা সংবলিত একটি বিলবোর্ডের সামনে দিয়ে গাড়ি এবং মনোসাইকেল চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: গেটি ইমেজেস।


মার্কিন এক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, এই নথি অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ রোববার ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রাথমিক সমঝোতায় সম্মতি দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পর শুরু হবে ৬০ দিনের একটি আলোচনা পর্ব, যেখানে চূড়ান্ত চুক্তির শর্ত নির্ধারণ করা হবে।


১৪ দফায় আসলে কী বলা হয়েছে?


১. সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি

খসড়ার প্রথম ধারায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা চলমান যুদ্ধে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করবে। এর আওতায় লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ভবিষ্যতেও একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা হুমকি না দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নয়, লেবানন সীমান্তের উত্তেজনাও কমতে পারে।

২. পরস্পরের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি

দুই দেশ একে অপরের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও স্বাধীনতাকে সম্মান করবে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরান পরস্পরকে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী করে আসছে। এই ধারা সেই অবস্থান থেকে আংশিক সরে আসার ইঙ্গিত।

৩. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি

এই সমঝোতা স্থায়ী নয়। দুই পক্ষকে ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। উভয় পক্ষ চাইলে সময়সীমা বাড়ানো যাবে। বর্তমান নথি মূলত একটি রাজনৈতিক কাঠামো; প্রকৃত সমাধান নির্ভর করছে পরবর্তী আলোচনার ওপর।

৪. যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নেবে

স্বাক্ষরের পরপরই ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে ইরানি বন্দরগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধের সময় ইরানের বন্দর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। অর্থনীতির জন্য এটি বড় স্বস্তি হতে পারে।

৫. হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করবে ইরান

ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ৩০ দিনের মধ্যে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মধ্যকার জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে। এ জন্য সমুদ্রের মাইন অপসারণসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৬. ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা করবে। এটি বাস্তবায়িত হলে ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহায়তা কর্মসূচিগুলোর একটি হতে পারে।

৭. নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি

জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞাসহ বিদ্যমান সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। ইরানের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাধা হলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। তাই এই ধারা তেহরানের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান অংশগুলোর একটি।

৮. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না ইরান

ইরান পুনরায় ঘোষণা করেছে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কী হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখা। এই ধারা সেই দাবির ভিত্তি।

৯. আপাতত বর্তমান অবস্থা বজায় থাকবে

চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বা অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াবে না। এটি উভয় পক্ষের জন্য একটি ‘বিশ্বাস তৈরির সময়’ হিসেবে কাজ করবে।

১০. তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানিতে ছাড়

সমঝোতা স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন সেবার ওপর বিশেষ ছাড় দেবে। ইরানের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি তেল রপ্তানি। ফলে এই ধারা সরাসরি দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সঙ্গে যুক্ত।

১১. জব্দ ও স্থগিত সম্পদ মুক্ত করা হবে

বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ও তহবিল ধীরে ধীরে মুক্ত করে দেওয়া হবে এবং সেগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন দেশে ইরানের বিপুল পরিমাণ সম্পদ আটকে রয়েছে। সেগুলো ফেরত পাওয়া তেহরানের বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।

১২. বাস্তবায়ন তদারকির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা

চুক্তির প্রতিটি ধারা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ তদারকি কাঠামো গঠন করা হবে। অতীতে অনেক চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এই ধারা সেই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা।

১৩. নির্দিষ্ট ধারা বাস্তবায়নের পর চূড়ান্ত আলোচনা

চতুর্থ, পঞ্চম, দশম ও একাদশ ধারা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর দুই পক্ষ বাকি বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় বসবে। অর্থাৎ ইরান আগে বাস্তব সুবিধা দেখতে চায়, তারপর বড় ছাড় দিতে আগ্রহী।

১৪. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন

চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে। এটি হলে চুক্তিটি শুধু দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা থাকবে না; আন্তর্জাতিক আইনি বৈধতাও পাবে।

সবচেয়ে বড় তিন প্রশ্ন


এই ১৪ দফা প্রকাশের পরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি—

ইরানের বর্তমান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের কী হবে?
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি কী?
৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন তহবিলের অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং কীভাবে পরিচালিত হবে?

এই কারণেই বিশ্লেষকদের মতে, ১৪ দফার খসড়া মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ভিত্তি তৈরি করলেও প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনার ওপর।