স্পোর্টস ডেস্ক। ক্রাইম ক্রনিকল
বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় কে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলছে তর্ক-বিতর্ক। সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিশ্বখ্যাত ক্রীড়া গণমাধ্যম The Athletic-এর প্রকাশিত ‘The Soccer 100’।
ফুটবল ইতিহাসের সেরা ১০০ খেলোয়াড়কে নিয়ে তৈরি এই বিশেষ তালিকায় সর্বকালের সেরা (GOAT) হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন লিওনেল মেসি।

২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বরে বইটি প্রথম প্রকাশ করে দি এথলেটিক। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ৪ জুন বইটির বিষয়বস্তু ও র্যাঙ্কিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনা হলে ক্রীড়া বিশ্লেষক, সাবেক ফুটবলার এবং ক্রীড়ামোদীদের মধ্যে শুরু ব্যাপক উন্মাদনা।
সেরা দশে যারা
‘দ্য সকার ১০০’ তালিকার শীর্ষ দশ খেলোয়াড়ের মধ্যে রয়েছেন—
১. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)
২. দিয়েগো (আর্জেন্টিনা)
৩. পেলে (ব্রাজিল)
৪. ইয়োহান ক্রুইফ (নেদারল্যান্ডস)
৫. ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল)
৬. জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স)
৭. রোনালদো নাজারিও (ব্রাজিল)
৮. ফ্রেঞ্জ বেকেনবাওয়া (জার্মানি)
৯. আলফ্রেডো ডি স্টেফানো (আর্জেন্টিনা/স্পেন)
১০. মিশেল প্লাতিনি (ফ্রান্স)
কেন মেসিই সর্বকালের সেরা?
তালিকা প্রণয়নকারীরা মনে করেন, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, অসংখ্য ব্যক্তিগত ও দলীয় অর্জন, বিশ্বকাপ জয় এবং ফুটবল খেলার ধরনে যুগান্তকারী ও অতুলনীয় প্রভাব রাখার কারণেই মেসিকে সর্বকালের সেরা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

মেসি যেন ফুটবলের সবচেয়ে নিখুঁত শিল্পী। ফুটবল এমন একটি খেলা যেখানে শুধু গোল করাই নয়, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা, ক্রিয়েটিভিটি, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, কঠিন মুহূর্তে দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেসি এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনন্য, অসাধারণ, অতুলনীয়।
এক ক্যারিয়ারে মেসি যা যা অর্জন করেছেন, তা যেকোনো সময়ের যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্য স্বপ্ন।
বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার- দ্য ব্যালন ডি অর, যা মেসি অর্জন করেছেন ৮ বার (রেকর্ড)। ধারে কাছেও নেই আর কোনো খেলোয়াড়।

অনেকেই মনে করেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মেসির চাইতে স্কোরিং এ ভালো। কিন্ত বাস্তবতা আসলে কি বলে? গোল স্কোরারদের জন্য নির্ধারিত সবচেয়ে সম্মান ও গৌরবের পুরস্কার 'ইউরোপীয়ান গোল্ডেন স্যু'। যা ক্রিস্টিয়ানো চারবার জিতলেও মেসি জিতেছেন ছয়বার (রেকর্ড)। এছাড়া মেসির ম্যাচ প্রতি গোল রেশিও রোনালদোর চাইতে বেশি। আর পেনাল্টি ছাড়া ওপেন প্লে গোলে মেসিই এগিয়ে।

এতো গেলো মেসির স্কোরিং এবিলিটি। প্লে মেকিং এর দিক থেকেও মেসি ই সেরা। ধারে কাছেও নেই আর কেউ। ৪০০ এর বেশি এসিস্ট নিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ এসিস্টধারী খেলোয়াড় লিওনেল মেসি।
এছাড়া ফুটবলে প্লেমেকারদের জন্য সবচেয়ে সম্মানজনক এওয়ার্ডটি হলো ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফুটবল হিস্ট্রি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস (IFFHS) প্রদত্ত ওয়ার্ল্ডস বেস্ট প্লেমেকার এওয়ার্ড।
এই পুরস্কারটিও মেসি জিতেছেন রেকর্ড সংখ্যক ৫ বার। স্পেনের জাভি জিতেছেন ৪ বার এবং বেলজিয়ামের কেভিন ডি ব্রুইনা জিতেছেন ৩ বার।
ইউরোপীয়ান গোল্ডেন স্যু জেতা কোনো খেলোয়াড় যেখানে এই পুরস্কারটি একবারো জিততে পারেননি সেখানে মেসি জিতেছেন সর্বোচ্চ বার। এখানেই মেসির বিশেষত্ব।
এছাড়া আর্জেনটিনার হয়ে মেসি বিশ্ব মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করেছেন বার বার। কোপা আমেরিকার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন দুইবার। জিততে পারতেন আরো একবার কিন্তু দল শিরোপা না জেতায় সেবার পুরস্কারটি নিতে অস্বীকৃতি জানান লিও। এছাড়া কোপায় ১বার জিতেছেন সর্বোচ্চ গোল দাতার পুরস্কার।

বিশ্বকাপের ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে জিতেছেন দুইটি ভিন্ন আসরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। এছাড়া একবার জিতেছেন সিলভার বুট।

তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রোনালদো এখানেও যোজন যোজন পিছিয়ে, বিশ্বকাপ বা ইউরো মঞ্চে জিততে পারেননি তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগত পুরস্কার।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি এসিস্ট (৮ ট), সবচেয়ে বেশিবার ম্যান অফ দ্য ম্যাচ(১১ বার), সবচেয়ে বেশি গোল কন্ট্রিবিউশন (২১ টি) এসব রেকর্ডের মালিক ও লিওনেল মেসি।
এছাড়া দলগতভাবেও মেসিই সেরা। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়নস লীগসহ বিভিন্ন দলের হয়ে মোট ৪৮ টি শিরোপা জিতেছেন তিনি। যা ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ। ২য় সর্বোচ্চ ৪৩ টি দলীয় শিরোপা জিতেছেন ব্রাজিলের ডানি আলভেস। রোনালদো ক্যারিয়ারে জিতেছেন ৩৫ টি শিরোপা।

এছাড়া ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশিবার ম্যান অফ দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হওয়া খেলোয়াড় ও মেসি। তিনি জিতিছেন ৩৯৫ টি ম্যান অফ দ্য ম্যাচ পুরস্কার। এখানেও ধারেকাছে নেই আর কেউ, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো জিতেছেন ১৭৬ বার।
সর্বোপরি বলাই যায়, যেকোনো একভাবে নয়, সবভাবেই মেসিই সেরা। মেসির তুলনা শুধু মেসি নিজেই।
মেসির মত এত প্রভাবশালী খেলোয়াড় কখোনই আসেননি এর আগে, ভবিষ্যৎ এ আসবে সে আশাও ক্ষীণ। অনেকেই মেসিকে বলেন ভিনগ্রহের খেলোয়াড়। ব্যাপারটি আসলেই নিছক মজা নাকি সত্যি? সন্দেহ থেকেই যায়। কারণ এই গ্রহের কারো পক্ষে তো ফুটবলে এমন অমানবীয় দক্ষতা দেখানো সম্ভব নয়, দেখাতে পারে নি আর কেউ।
এ গ্রহেরই হোন বা ভিন্ন কোনো গ্রহের, লিওনেল আন্দ্রেস মেসি অনন্য, অনবদ্য, অবিসংবাদিত, অতুলনীয়, অতিমানবীয়.... বিশেষণ যতই দেয়া হোক না কেনো তা যেন কম পরে যায়।
শেষ কথা
ফুটবল ইতিহাসের সেরা কে—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর হয়তো কখনোই পাওয়া যাবে না। কারণ যুক্তি নয়, এখানে ভক্ত সমর্থকদের আবেগই হয়ে ওঠে শেষকথা। ‘দ্য সকার ১০০’ আবারও সেই চিরন্তন বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। আর তালিকার শীর্ষে লিওনেল মেসির অবস্থান নতুন করে ফুটবলবিশ্বকে বিভক্ত করেছে দুই ভাগে—একদিকে মেসি সমর্থকরা, অন্যদিকে মেসির প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভক্তরা।