স্পোর্টস ডেস্ক, ক্রাইম ক্রনিকল


ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে গোলের ভাষা সবসময়ই ছিল কিংবদন্তিদের ভাষা। একসময় বলা হয়েছিল, পেলের ৭৭ গোলের রেকর্ড ভাঙবেন কারেকা। পরে মনে করা হয়েছিল, সেটি হয়তো করবেন রোমারিও। এরপর প্রায় নিশ্চিত ধরেই নেওয়া হয়েছিল, রেকর্ডটি একদিন ভেঙে ফেলবেন রোনালদো নাজারিও।


কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় সত্যগুলোর একটি হলো, সবচেয়ে সম্ভাব্য মানুষটিই সবসময় ইতিহাস লেখেন না।


অবশেষে সেই রেকর্ড ভাঙলেন এমন একজন, যাকে একসময় বলা হতো ‘গোলদাতা নয়, সুযোগ তৈরি করা শিল্পী’। যাকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল, আন্তর্জাতিক ফুটবলের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে তিনি কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন।


সেই মানুষটির নাম নেইমার।


আজ ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। ৭৯ গোল নিয়ে ছাড়িয়ে গেছেন ফুটবলের রাজা পেলেকেও। অথচ এই যাত্রা কখনোই ছিল না সহজ। ছিল চোট, বিতর্ক, কান্না, অপূর্ণতা আর বিশ্বকাপ জয়ের অদম্য ক্ষুধা।


যে শিশুকে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন জিতো


নেইমারের প্রতিভার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল তার বয়স যখন মাত্র ১০। ব্রাজিলের দুইবারের বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার জিতো একদিন তাকে ফুটসাল খেলতে দেখে বিস্মিত হয়ে যান।


পরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সান্তোস সভাপতির কাছে গিয়ে বলেছিলাম, এই ছেলেকে এখনই দলে নিতে হবে।’


সমস্যা ছিল একটাই। সেই বয়সের জন্য সান্তোসের কোনো একাডেমি দল ছিল না। জিতোর উত্তর ছিল, ‘তাহলে একটা দল তৈরি করুন।’


সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ভবিষ্যৎ।


মাত্র ১৩ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদে ট্রায়াল দেন নেইমার। তখন ক্লাবটিতে ছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম, রবার্তো কার্লোস, রোনালদো নাজারিও ও জিনেদিন জিদানের মতো তারকারা। রিয়াল মাদ্রিদ তাকে দলে ভেড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নেইমার থেকে যান সান্তোসেই।


২০০৯ সালে ১৭ বছর বয়সে অভিষেকের পর থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের নতুন বিস্ময়।


২০১০ বিশ্বকাপ: যে আসরে শুরুই হয়নি নেইমারের গল্প


২০১০ বিশ্বকাপের আগে গোটা ব্রাজিলে দাবি উঠেছিল, তরুণ নেইমারকে দলে নিতে হবে। এমনকি পেলের মতো কিংবদন্তিও কোচ দুঙ্গাকে অনুরোধ করেছিলেন।


কিন্তু দুঙ্গা সিদ্ধান্ত বদলাননি।


সৃজনশীলতার অভাবে সেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় ব্রাজিল। অনেকের বিশ্বাস, সেদিনই শুরু হয়েছিল ব্রাজিলের ‘যদি নেইমার থাকত’ আফসোস।


২০১৪: ঘরের মাঠে উত্থান, তারপর হৃদয়ভাঙা বিদায়


২০১৪ বিশ্বকাপ ছিল নেইমারের প্রথম বিশ্বকাপ। পুরো ব্রাজিলের আশা-ভরসা তখন এই তরুণ সুপারস্টারের কাঁধে।


তিনি হতাশ করেননি।


৫ ম্যাচে করেন ৪ গোল, সঙ্গে একটি অ্যাসিস্ট। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল, ক্যামেরুনের বিপক্ষে আরও দুই গোল। প্রতিটি ম্যাচেই তিনি ছিলেন ব্রাজিলের আক্রমণের প্রাণ।


কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার হুয়ান জুনিগার ভয়ংকর ফাউলে মেরুদণ্ডে গুরুতর চোট পান নেইমার। সেই চোট তাকে ছিটকে দেয় সেমিফাইনাল থেকে।


তারপরই আসে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রাত। জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের হার।


অনেক ব্রাজিলিয়ান এখনও বিশ্বাস করেন, নেইমার থাকলে সেই রাতের ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতো।


সেই বিশ্বকাপে ব্রোঞ্জ বুট জিতেছিলেন নেইমার।


২০১৮: চোট নিয়েও লড়াই


রাশিয়া বিশ্বকাপের আগে মেটাটারসাল ইনজুরি কাটিয়ে পুরোপুরি ফিট ছিলেন না নেইমার। তবু ৫ ম্যাচে করেন ২ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট।


কোস্টারিকা ও মেক্সিকোর বিপক্ষে তার গোল ছিল ব্রাজিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু ছিলেন তিনিই।


২৬টি ফাউলের শিকার হন নেইমার, যা ছিল ওই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে ২৩টি সফল ড্রিবল করে দেখিয়ে দেন, কেন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ওয়ান-অন-ওয়ান খেলোয়াড়দের একজন বলা হয়।


তবু শেষরক্ষা হয়নি। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে ২-১ গোলে হেরে আবারও বিদায় নেয় ব্রাজিল।


২০২২: পেলের রেকর্ড স্পর্শ, তবু বিশ্বকাপ অধরা


কাতার বিশ্বকাপেও চোট পিছু ছাড়েনি নেইমারকে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই গোড়ালির চোটে পড়ে পরের দুটি ম্যাচ মিস করেন তিনি।


তবু ফিরে এসে দক্ষিণ কোরিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল করেন। বিশেষ করে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে করা সেই গোলটি ছিল নিখুঁত শিল্পকর্ম।


সেই গোলেই তিনি স্পর্শ করেন পেলের ৭৭ গোলের রেকর্ড।


কিন্তু নির্মম ট্র্যাজেডি যেন নেইমারের বিশ্বকাপ ভাগ্যের স্থায়ী সঙ্গী। টাইব্রেকারে হেরে আবারও কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নেয় ব্রাজিল।


ম্যাচশেষে কান্নায় ভেঙে পড়া নেইমারের ছবি যেন পুরো এক প্রজন্মের হতাশার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।


তিন বিশ্বকাপে নেইমারের পরিসংখ্যান

ম্যাচ: ১৩ 

গোল: ৮ 

অ্যাসিস্ট: ৪ 

মোট গোল অবদান: ১২ 


ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে গোলদাতাদের তালিকায় বর্তমানে যৌথভাবে ষষ্ঠ স্থানে আছেন নেইমার। তার ওপরে রয়েছেন রোনালদো নাজারিও (১৫), পেলে (১২), আদেমির ডি মেনেজেস, ভাভা ও জাইরজিনিও।


নেইমারের অনন্য বিশ্বকাপ রেকর্ড

পেলে ও রোনালদোর পর ব্রাজিলের তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে তিনটি আলাদা বিশ্বকাপে গোল করেছেন। 

২০২২ বিশ্বকাপে পেলের আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন। 

২০১৮ বিশ্বকাপে কোস্টারিকার বিপক্ষে ৯০+৭ মিনিটে করা তার গোলটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম দেরিতে হওয়া গোল। 


জাতীয় দলের জার্সিতে সোনালি মুহূর্ত


বিশ্বকাপ না জিতলেও ব্রাজিলের হয়ে নেইমারের সাফল্য কম নয়।


২০১৩ কনফেডারেশন্স কাপে ৫ ম্যাচে ৪ গোল করে জেতেন গোল্ডেন বল। ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে তার গোল এখনও টুর্নামেন্টটির অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।


আর ২০১৬ রিও অলিম্পিকে তিনি পূরণ করেন ব্রাজিলের বহুদিনের স্বপ্ন। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয়সূচক শট নিয়ে এনে দেন অলিম্পিক স্বর্ণ।


আবার ফিরছেন নেইমার


২০২৩ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে এসিএল ছিঁড়ে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন নেইমার।


কিন্তু তিনি হার মানেননি।


২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে জানুয়ারিতে শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফেরেন। কারণ একটাই, আরেকবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখা।


তার ভাষায়,

‘এটাই হবে আমার শেষ মিশন। যেকোনো মূল্যে আমি বিশ্বকাপ ট্রফিটা জিততে চাই।’


সম্প্রতি নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তি আবারও ডাক দিয়েছেন তাকে। অনেকেই ভেবেছিলেন, নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হয়তো শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সির গল্প এখনো শেষ হয়নি।


অপূর্ণতার মধ্যেও এক অমর উত্তরাধিকার


নেইমারের ক্যারিয়ারকে অনেকে অপূর্ণ বলেন, কারণ তার হাতে বিশ্বকাপ নেই।


কিন্তু শুধুই কি ট্রফি দিয়ে একজন ফুটবলারের মহত্ত্ব মাপা যায়?


যে ছেলেটি ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবলকে আধুনিক যুগে নতুন করে জীবন্ত করেছে, যে একাই কোটি মানুষের আনন্দ-কান্নার কারণ হয়েছে, যে চোটের পর চোট নিয়েও বারবার ফিরেছে, তার গল্প আসলে সংখ্যার চেয়ে অনেক বড়।


নেইমারের বিশ্বকাপনামা তাই শুধু গোল-অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যান নয়।


এটি এক অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প।

এক শিল্পীর গল্প।

এক ব্রাজিলিয়ানের গল্প, যার চোখে এখনও জ্বলছে বিশ্বকাপ ছোঁয়ার শেষ আলো।