ঝাপ
রাইয়ান কবির

সারাদিন শুয়ে শুয়ে ফোন চালানো আর গান শোনা ছাড়া ইদানীং আমার আর কিছুই করার নেই। মনটা ধীরে ধীরে তিতিয়ে উঠছে। এভাবে আর কত দিন সারাটা সময় শুয়ে কাটাতে হবে? শরীর ঝিমিয়ে গিয়ে কেমন যেন বিরক্তিকরভাবে ম্যাজ ম্যাজ করতে থাকে। মাঝেমধ্যে উঠে টুকটাক হাটাচলার চেষ্টা করি, কিন্তু তা ওই টুকটাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই একটু ক্রাচ নিয়ে ড্রইংরুমে পায়চারি করা অথবা কোনো রকমে হেটে ওয়াশরুমে যাওয়া। এটুকু না করলে হয়তো আমার শরীরটা পুরোপুরি বিছানার সাথে লেগেই যেত। আচ্ছা, আমার কী হয়েছে সেটাই তো এখনো বলা হলো না!

স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে বান্দরবানে ঘুরতে গিয়েছিলাম। একটা পাহাড়ের খাদে ছবি তুলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পা ফসকে পড়ে যাই। সৌভাগ্যবশত, খাদটা গভীর ছিল না। তবে দুর্ভাগ্যবশত, একটা শক্ত পাথরের উপর পড়েছি। এর ফলে গোড়ালির ওপরের দিকটা অনেকটাই ফ্র্যাকচার হয়ে গিয়েছে। হাতে আর কপালেও কাটাকুটি হয়েছে। লোকালয় থেকে একটু দূরে থাকায় সেদিন হাসপাতালেও যাওয়া হয়নি। কোনো রকমে লাঠিতে ভর দিয়ে হেটে আবার লোকালয়ে ফিরে এসেছিলাম।

পরদিন এক্স-রে করে টের পেলাম অবস্থা বেশ খারাপ। যতটুকু ভেবেছিলাম তার চেয়ে বেশি পরিমাণে হাড় ফ্র্যাকচার হয়েছে। কমপক্ষে মাস তিনেক লাগবে পুরোপুরি সুস্থ হতে। ডাক্তার জাদরেল কণ্ঠে বলে দিয়েছেন, "নো মুভমেন্ট, অ্যাবসোলিউটলি নো মুভমেন্ট।"

এই ঘটনার পর আরও দেড় মাস কেটে গেল। অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। শারীরিক অবস্থার সাথে সাথে আমার মানসিক অবস্থারও অনেকটাই অধঃপতন ঘটেছে। সারাদিন মাঠে খেলে বেড়ানো মানুষকে যদি দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা বিছানায় বন্দী থাকতে হয়, তবে তার অস্বস্তি লাগাটাই স্বাভাবিক।

আমার বাসার মানুষজন আধুনিক হলেও ধর্মকর্ম বা ঝাড়ফুক যে মোটেও মানে না, তেমন নয়। গতকাল বিকেলে চাচু এসে বললেন, নদীর ওপারে একটি গ্রামে নাকি আফসারী আউলিয়া নামে এক বিখ্যাত কবিরাজ আছেন। মেডিকেল ট্রিটমেন্ট চলছে চলুক, পাশাপাশি কবিরাজের সাথে দেখা করতে ক্ষতি কী!

আমার দ্বিমত করার কোনো কারণই ছিল না। কবিরাজ দেখানোর উছিলায় একটু মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাব! বাবা-মাও সহজে রাজি হয়ে গেলেন।

পরদিন খুব ভোরে আমি আর চাচু রওনা দিলাম। নৌকায় নদী পার হয়ে একটি ভ্যান ভাড়া করতে হলো। ভ্যান ভাড়া করতে গিয়ে যা বুঝলাম, তাতে মনে হলো—এদিকের সবাই এই কবিরাজকে চেনে, যথেষ্ট সম্মান ও সমীহের চোখে দেখে। আফসারী কবিরাজের বাসা বলাই সব ভ্যানওয়ালা তাকে চিনতে পারল। ততক্ষণে আমার বেশ ফুরফুরে লাগছে। মুক্ত বাতাস, দুপাশে মাছের ঘের, আবার কখনো কখনো রাস্তার ধার ধরে সীমানার মতো রয়েছে গাছ। এর মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল আমাদের ভ্যান। মাঝে মাঝে দু-একটা পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছিল। এত দিন ঘরে বন্ধ থাকার পর এমন পরিবেশে মন ভালো না করে উপায় কী! গ্রামীণ কাঁচা-পাকা রাস্তায় প্রায় আধঘণ্টা চলার পরে আমরা গন্তব্যে পৌছালাম।

আফসারী কবিরাজের বাসা বা আস্তানা ঠিক চকের মতো ছিল না। নিতান্তই সাদাসিধে, সাধারণ গ্রামের বাসা যেমন হয়, তেমনই ছিল। একটা বড় উঠানের চারদিকে চারটি আলাদা গোলপাতার ছাদওয়ালা ছোট-বড় ঘর। শুধু একটা ঘর ছিল টিনের ছাদওয়ালা। আমার মতো আরও কিছু মানুষ গিয়েছিল কবিরাজের সাথে দেখা করতে। হাসপাতালের মতো সিরিয়াল দিতে হলো। প্রায় ৪৫ মিনিট পরে আমার সুযোগ এলো।

আমি আর চাচু আস্তে আস্তে টিনের ছাদওয়ালা বড় ঘরটিতে ঢুকলাম। বাসার ভেতরটা বেশ অন্ধকার; তখন যে কেবল বেলা দশটা বাজে, তা বোঝার উপায় নেই। বুঝলাম, এই বাসাতে কয়েকটি ঘর রয়েছে। আমরা মাঝের বৈঠকখানাটিতে বসলাম। সামনের ঘর আর এই ঘরটির মাঝে একটি বড় লাল রঙের পর্দা দেওয়া, তার ওপারেই রয়েছেন আফসারী কবিরাজ। পর্দাটি ছিল টকটকে লাল রঙের, আর তার ওপর অনেক রকম চিহ্ন আঁকা। কবিরাজের আসতে একটু সময় লাগছিল বলে নকশাগুলো দেখতে লাগলাম। নকশাটি অনেকটা গাছের মূলের মতো একটি প্যাটার্ন। প্রতিটা মূলের শাখা-উপশাখা গিয়ে সংযুক্ত হয়েছে অক্টাহেড্রন ধরনের একটি জ্যামিতিক আকৃতির কোনায় কোনায়। অক্টাহেড্রন আকৃতিগুলোর মধ্যে কেমন যেন ঢেউয়ের মতো চিহ্ন আঁকা। ওগুলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হলো অক্টাহেড্রনগুলোর বাহুগুলো যেন তরল পদার্থের মতো করে নড়ছে। আমি আরও একটু নিশ্চিত হতে কাছে গিয়ে যখন দেখতে যাব, তখনই পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে আসলেন আফসারী কবিরাজ।


বলতে দ্বিধা নেই, মনে মনে এই কবিরাজ সাহেবের যে ছবি একে রেখেছিলাম, আমার সামনে মানুষটির সাথে তার আকাশ-পাতাল তফাৎ। চল্লিশের কোঠার সুঠাম দেহের সুদর্শন একজন মানুষ উনি। মুখে হালকা চাপ দাড়ি। তার পোশাকও বেশ সাধারণ। রাস্তাঘাটে বা মাজারে বা জাদুকরদের যেমন দেখা যায়, দেখতে মোটেও সে রকম কিছু নন। আমি কিছু বলার আগেই প্লাস্টারের ওপর থেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমার পা তিনি দেখতে লাগলেন। তারপর বললেন, "ঝাপ দেওয়া লাগব। সমেস্যা নাই। কয়ডা দিনের মদ্যেই ঠিক হইয়া যাইব।"

এই বলে তিনি আবার পর্দার ওপাশে চলে গেলেন। আমি চাচুর দিকে তাকালাম। চাচু হাত দিয়ে ইশারা করে আমাকে আশ্বস্ত করলেন। দেখা যাক কী হয়!

হঠাৎ প্রচণ্ড 'ধূপ ধাপ' কিছু পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম। এতক্ষণের নীরবতার মধ্যে এই বিকট শব্দটি শুনে লাফ দিয়ে উঠলাম। বিড়াল মারামারি করছে কি? বিড়াল লাফালে তো এত জোরে শব্দ হওয়ার কথা না! তাহলে? বেশ কিছুক্ষণ শব্দটি হলো। এর মধ্যেই পর্দার ওপাশ থেকে একটি ক্ষীণ গোঙানির শব্দ ভেসে এলো। পাঁচ-ছয় সেকেন্ড হবে হয়তো। তারপর হঠাৎ সব স্তব্ধ হয়ে গেল। না কোনো গোঙানির শব্দ, না ছাদের ওপর বিড়ালের মারামারির শব্দ—সব চুপ!

লাল পর্দাটি সরিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে কবিরাজ ফিরে আসলেন। তবে এবার তার চেহারায় অন্য রকম কিছু একটা ছিল। ঠিক বলে বোঝানো সম্ভব নয়, তবে সরাসরি তার দিকে তাকাতে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। তার চোখের সাদা অংশটা এই অন্ধকারে কেমন যেন হলুদ আলোর মতো জ্বলজ্বল করছে। দেখলাম, উনি হাতে করে কিছু লতাপাতা নিয়ে এসেছেন। সেগুলো আমার সামনে রেখে বললেন, "এই কাজ শুরু করার আগে এই প্লাস্টার খোলার দরকার ছিল। কিন্তু তোমার তো নাকি আরও কয়ডা দিন এডি রাখা লাগব। আচ্ছা, সমেস্যা নাই। এর উপরে দিয়াই কাজ চালাই দিমু।"

এ বলে উনি কোথা থেকে কিছু নির্যাস বের করে একটি পাত্রে রাখলেন। তারপর প্লাস্টারের ফাঁকা থেকেই ফোটায় ফোটায় একটি সিরিঞ্জের মাধ্যমে নির্যাসগুলো ভিতরে প্রবেশ করালেন। অবাক হয়ে দেখছিলাম তার কাজ। আমার চোখের ভুল কিনা বলতে পারব না, তবে খেয়াল করলাম—যেটুকু নির্যাস হয়তো প্লাস্টারের গায়ে লেগেছিল, এক সেকেন্ডের মধ্যেই যেন সেই দাগ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমি অবাক হলেও এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করলাম না। সেই নির্যাস লাগানো শেষ হলে লতাপাতাগুলো চাবুকের মতো পেচিয়ে আমার প্লাস্টারের ওপর থেকেই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বেধে দিলেন। তারপর চোখ বন্ধ করে কিছু দোয়া-দরুদ পড়তে থাকলেন আর পায়ের ওই স্থানে ফুঁ দিতে থাকলেন। আমি মিশ্র প্রতিক্রিয়া নিয়ে পুরো বিষয়টি দেখতে লাগলাম। বুঝতে পারছিলাম না আমার কি শান্ত হওয়া উচিত, নাকি বিরক্ত।

দোয়া পড়া শেষ করে কবিরাজ চোখ খুলে সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকালেন। অদ্ভুত শীতল কণ্ঠে বললেন, "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।" তার চোখ দেখে আমি আবারো ভয় পেয়ে গেলাম। এক শীতল স্রোত বয়ে গেল আমার মেরুদণ্ড বরাবর। আমি হ্যাঁ-সূচক ভাবে মাথা নাড়ালাম। "এক মাস রাখবা, এর মদ্দে একবারও খোলার চেষ্টা করবা না। যেইটাই হোক না ক্যান, খোলার চেষ্টা করবা না। বুঝছো তো, তাই না? তোমরা আজকালকার পোলাপান তো আবার এগুলা মানতে চাও না। তা এহানে আইছোই যহন, যা বলি মন দিয়া হুইনো। ঠিক এক মাস পর ইহানে আবার আসবা। প্লাস্টারে খাউজানি হইতে পারে, জ্বালা-জ্বলি হইতে পারে, তয় ভুলেও এডি খুলবা না। এহন ওঠো তাড়াতাড়ি, তোমার সময় শেষ।"


তার কথা শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাড়াতাড়ি আমরা উঠে গেলাম। তাকে সালাম দিয়ে যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলাম, তিনি আবারও বললেন যেন না খুলি। তার কথার মধ্যে কেমন যেন সম্মোহনী ব্যাপার ছিল। শেষ কিছুক্ষণের কথায় যেন আমার তার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস চলে এসেছিল। বলে বোঝানো সম্ভব না, তবে কেন যেন আমার মনে হলো, জীবন দিয়ে হলেও এই 'ঝাপ' আমি সময়ের আগে খুলব না।

 

**  **   **  **  **

বুকটা ভয়ানক ধড়ফড় করছে। দু-তিনবার 'পানি, পানি' বলে চিৎকার করার চেষ্টা করলাম। গলা থেকে কোনো আওয়াজই বের হলো না। মনে হচ্ছিল গলা ছিড়ে যেন রক্ত বেরিয়ে আসবে, তাও কোনো আওয়াজ বের হবে না। অক্সিজেনের অভাবে চোখগুলো বড় বড় হয়ে কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন। খামচে ধরলাম বিছানার চাদর। এক্ষুনি, এক্ষুনি কিছু একটা করতে হবে। হাতের কাছে বালিশটা ধরে ছুড়ে মারলাম রিডিং টেবিলটার উপরে রাখা কাচের গ্লাসটার দিকে। এটুকুই যেন আমার শেষ শক্তিটুকুও নিঃশেষ করে দিল।

তবে কাজ হয়েছে। কাচের গ্লাসটা মাটিতে পড়ে 'ঝন ঝন' আওয়াজ করে ভেঙে গেল। কাচ ভাঙার শব্দ পাশের রুমে গিয়েছে নিশ্চয়ই। বাবা-মা শুনতে পেয়েছে নিশ্চয়ই। যদি শুনতে না পায়? যদি বুঝতে না পারে কোথা থেকে শব্দটি এল? তাহলে কী হবে?

ভয়ে ও অজানা আশঙ্কায় আমার শরীর আরও অবশ হয়ে আসল। শ্বাসকষ্টের মাত্রা আগের চেয়েও যেন বেড়ে গেল। সর্বোচ্চ আর কয়েকটা সেকেন্ড আমি এভাবে থাকতে পারব। আমি টের পাচ্ছিলাম, ওগুলো আবার মুখ পেচিয়ে ধরছে। আমার চোখের ওপর চেপে ধরছে। তারকাটাগুলোর মতো দাগ সমগ্র মুখ ক্ষতবিক্ষত করার চেষ্টা করছে। সাপের মতো আমার গলা পেচিয়ে যাচ্ছে, আর কয়েক সেকেন্ড থাকলেই আমার ঘাড়ের হাড় দুমড়ে-মুচড়ে যাবে।

কই বাবা! কই মা! কোথায় তোমরা?

হঠাৎ ঘরের আলো জ্বলে উঠল। তার সাথে সাথে আমার শরীরে যেন আত্মা ফিরে আসল। আব্বা-আম্মা তড়িঘড়ি করে আমার রুমে চলে এসেছেন। মা এসে আমার পিঠে হাত দিয়ে একটু ধাতস্থ হতে সাহায্য করলেন। বাবা পানি এগিয়ে দেওয়ার পরে কোনো রকমে একটু পানি খেলাম।

ততক্ষণে লক্ষ্য করলাম, লতাপাতাগুলো শরীর থেকে সরে গিয়েছে। আবার তাদের স্বাভাবিক অবস্থানে চলে গিয়েছে। বিছানায় ওগুলো যে ছড়িয়ে ছিটিয়েছিল, সেটার চিহ্ন এখনো কিছু কিছু বুঝতে পারছি। আমার হাতে ও গলায় বিভিন্ন জায়গায় যে এখনো লাল দাগ হয়ে আছে, সেটার দিকে তাকিয়ে মা বললেন, "এভাবে হয় না, কালই এর একটা ব্যবস্থা করতে হবে।" বাবা এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখে মুখে শঙ্কা। তাকে নতুন করে আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই কী ঘটেছে। এই নিয়ে পরপর চারবার একই রকম ঘটনা ঘটল।

প্রথমবার আমি ভেবেছিলাম হয়তো দুঃস্বপ্ন দেখছি। আসলে যে পরিমাণ মানসিক চাপ ও একঘেয়েমির মধ্যে যাচ্ছিলাম, দুঃস্বপ্ন দেখা অস্বাভাবিক নয়। প্রথমবার আমি ঘুমের মধ্যে দেখেছিলাম একটি খোলা বিস্তীর্ণ মাঠের সামনে একটি চেয়ারে বসে আছি। পায়ের ব্যথাটা টের পাচ্ছিলাম। প্লাস্টারের ভিতরে প্রচণ্ড চুলকানি শুরু হলো। পাগলপ্রায় তখন আমি, হাতটা ওই স্থানে দিতেই লতাপাতাগুলো হঠাৎ আমার হাত বেয়ে উপরে আসতে থাকল। মনে হচ্ছিল প্লাস্টারটাও যেন বড় হচ্ছে। পায়ের গোড়ালির উপরের দিক থেকে সারা পায়ে ছড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ওই লতাগুলো আস্তে আস্তে এসে আমার মুখের মধ্যে ঢুকে যাওয়া শুরু করল। ঐদিন ঐ মুহূর্তেই আমি ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ি। সেদিন কাউকে কিছু না বললেও যখন একই ঘটনা পরদিন ঘটল, আমি ভয়ে চেঁচামেচি শুরু করি। আমার দুঃস্বপ্নের কথা বাবা-মাকে বলি। তারা মানসিক চাপের কথা বলেই ব্যাপারটা সামলে নিতে বললেন। তাদের কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করার মতো ছিল না। তবে পরবর্তীতে অবাক হলাম, যখন দেখি ঘরের বিভিন্ন স্থানে লম্বা লম্বা কিছু লতাপাতা ছড়িয়ে আছে। এগুলো কোনোভাবেই ঘরের মধ্যে আসার কথা না। তাদের ডেকে সেগুলা দেখাই। ওনারাও যথেষ্ট অবাক হয়েছিলেন। আর দ্বিতীয় দিনের পর থেকে আমার কেমন যেন অস্বস্তিও হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সারা শরীরের উপর কিছু একটা পেচিয়ে যাচ্ছে।

তৃতীয়বার যখন ঘটনাটি ঘটে, পাঁচ দিন পর। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি জেগে আছি। এটা কোনোভাবেই দুঃস্বপ্ন হতে পারে না। দুপুরে খাবারের পর রুম অন্ধকার করে শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হয়তো একটু তন্দ্রা এসেছিল, তবে পুরোপুরি ঘুমাইনি—এটা আমি নিশ্চিত। একটি গল্পের বই পড়ছিলাম, হঠাৎ মনে হলো কোনো নড়াচড়া টের পাচ্ছি। তখনো আমার মাথায় কোনো অতিপ্রাকৃত সম্ভাবনা উঁকি দেয়নি। বরং ভয় পাচ্ছিলাম কোনো সাপ ঢুকল কিনা! আমি বিছানা থেকে লাফ দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার শরীর যেন বিছানার সাথে শক্ত হয়ে লেগে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল শরীরের ওপর ভারী কিছু একটা আবরণ পড়ে গিয়েছে। সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করার পরেও মনে হচ্ছিল যেন শক্তিশালী আঠা আমাকে বিছানার সাথে আটকে রেখেছে। আমার দু-পা যেন একসাথে জোড়া লেগে যাচ্ছে। চোখের ভুল কিনা জানি না। দেখলাম আমার দুটো পা একসাথে ওই লতাপাতার বাঁধনে জড়িয়ে গিয়েছে। ভয়ের সর্বোচ্চ সীমানায় চলে গেলাম তখন। গলা ফাটিয়ে প্রচণ্ড চিৎকার করার চেষ্টা করলাম। এত ভয়ানক আর্তনাদ যে নিজের গলাও নিজে চিনতে পারলাম না। তারপর হঠাৎ করে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসার অন্যরা চলে আসলেও এতটুকু সময় যেন আমার কাছে চিরকালের চেয়েও বেশি ছিল।

আজকের ঘটনাটাও আগেরবারের মতোই হয়েছে। তবে আমি এখন এতোটুকু নিশ্চিত যে ঘটনাটা কেবল মানসিক না। আমার সারা শরীর যে কিছু একটা দিয়ে শক্ত করে বাঁধা ছিল, এবং তার ফলে যে কালো কালো দাগ পড়ে গিয়েছে, তা আজ ভয়ানক আকারে স্পষ্ট। এবং শুধু আমি না, বাসার অন্যরাও ব্যাপারটা দেখতে পেয়েছে। বাবা বললেন, "অনেক হয়েছে, এখনই এই জিনিস খুলে ফেলা দরকার।" যদিও কবিরাজ বলেছিলেন কোনোভাবেই যেন এটা না খুলি, তবে এত কিছুর পর নির্দেশ মানার আমি আর কোনো কারণ দেখি না। বাবা রান্নাঘর থেকে একটা ছুরি নিয়ে আসলেন।

প্রথম ছোরাটা দেওয়ার সাথে সাথে খুব অদ্ভুত ব্যাপার স্যাপার শুরু হলো। ওই লতাগুলো সবার সামনেই সঞ্চালিত হয়ে উঠল। মা এবং চাচু প্রচণ্ড ভয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলেন। প্লাস্টারটা আগের চেয়ে দ্রুত গতিতে আমার সারা শরীরে ছড়ানো শুরু করল। যেন জীবন্ত কোনো চোরাবালি একটু একটু করে আমাকে গ্রাস করছে। ছুরির প্রতিটা আঘাতের সাথে সাথে আগের চেয়েও দ্রুতগতিতে আমার সারা দেহে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আমি ওদের অংশ হয়ে যাচ্ছি অথবা ওরা আমার অংশ হয়ে যাচ্ছি।

আমার মনের মধ্যে তখন কী চলছিল—আমি বোঝাতে পারব না। সংশয়? ভয়? নাকি বিস্ময়?

না, অদ্ভুতভাবে এগুলোর কোনোটা নয়। কেন যেন মনের মধ্যে এক প্রশান্তির হাওয়া বইতে শুরু করেছিল। ব্যাপারটা ঠিক বলে বোঝানো সম্ভব না। এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা।

পরম শান্তি নিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, অথবা হয়তো জ্ঞান হারিয়েছি, আমার মনে নেই। জ্ঞান ফেরার পর দেখলাম আমরা গাড়িতে। প্রচণ্ড বেগে আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে গ্রামের পথ দিয়ে। উঠে বসার চেষ্টা করলাম, নিজের শরীরের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রইলাম। শরীরের নিচের অংশটি যেন মানুষের নয়, প্রকাণ্ড কোনো গাছের কাণ্ডের অংশ। অথবা তাকে বলা যেতে পারে কোনো জৈবিক বর্ম। এত অদ্ভুত শান্তি আমি হয়তো আগে কখনোই বোধ করিনি। মাতৃগর্ভে থাকাকালীন নিরাপত্তার যে অনুভূতি, আমাকে তখন সেই অনুভূতি পেয়ে বসেছে। আমি ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বাবা-মাকে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করলাম। তবে মনে হয় না আমার বলায় কিছুই আসে যায়।

কখন যেন কবিরাজের বাড়ি পৌছে গিয়েছি। আমাকে গাড়ির মধ্যে চিত করে শুইয়ে রেখে বাবা ও চাচু নামলেন কবিরাজের সাথে কথা বলতে। তখন সন্ধ্যা প্রায়। কিছুক্ষণ পর ওনারা ফিরে আসলেন। বাবা কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। তাদের সাথে এ বাড়ির একজন বয়স্ক  মানুষও ছিল। তার চেহারায় প্রচণ্ড দুঃখ ও হতাশা স্পষ্ট ছিল। মা মরিয়াভাবে জিজ্ঞেস করলেন, "কী হয়েছে? ওকে তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নামানো দরকার। এক্ষুনি ওকে কবিরাজের কাছে নিয়ে যেতে হবে। এই ভণ্ড কবিরাজ কী জাদু করেছে, এখনই জানা দরকার। কিছু হয়ে গেলে মেরে ফেলব ওকে!" বাবা ও চাচু তখনও চুপ করে থাকায় মা আবারও জিজ্ঞেস করলেন, "কথা বলছ না কেন? নামাও ওকে!" তারপর  ঐ বৃদ্ধ মানুষটি যা বললেন, তা শোনার জন্য কারও পক্ষে প্রস্তুত থাকা সম্ভব নয়।


গত সপ্তাহে কোনো এক তন্ত্রসাধনার সময় ভুলত্রুটির কারণে ভয়ানক কোনো জিনকে ডেকে এনে কবিরাজ সাহেব তাকে মুক্ত করে দিয়েছেন। তখনও মানুষ কবিরাজের সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছিল। তারা দেখতে পায় কবিরাজ নগ্ন অবস্থায় তার বাসা থেকে উঠানে বেরিয়ে এলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হঠাৎ করেই হাত-পায়ের জয়েন্টগুলো বাকানো শুরু করে। প্রচণ্ড বীভৎসভাবে শরীরের প্রতিটি মাংসপেশি যেন কেউ মোচড় দিয়ে ধরেছিল। প্রচণ্ড জোরে অদৃশ্য কেউ যেন একজন কবিরাজের গলা চেপে ধরে। চোখ কোটর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে। এত আতঙ্কগ্রস্ত অনেকেই এ মুহূর্তের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে যায়। সেই বীভৎস নারকীয় দৃশ্য কমপক্ষে পনেরো জন প্রত্যক্ষ করেছে। এখানেই শেষ নয়, ওই দূরের উচুগাছটিতে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে ফেলানো হয় কবিরাজকে। চামড়া ফুটো হয়ে গাছের ডাল হুকের মতো আটকে যায়। এভাবে নাকি প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা জীবন্ত অবস্থায় তিনি ঝুলে ছিলেন। সাহসী দু-একজন মানুষ তাকে নামানোর চেষ্টা করলেও তাদেরও খুবই বীভৎস পরিণতি বরণ করতে হয়। একসময় ডালটি ভেঙে কবিরাজ মাটিতে পড়ে যান। ততক্ষণে তার দেহে প্রাণ বলে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এই ঘটনার পর থেকে শোনা গিয়েছে, কবিরাজের চলমান যে ক'জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, সবার সাথেই খারাপ ঘটনা ঘটছে। এগুলোর কোনো সুরাহা এখনো কেউ করতে পারছে না। ঘটনা বলতে বলতে বৃদ্ধ মানুষটি কখন যেন কেঁদে দিয়েছেন।  

 

আমি বাদে বাকি সবাই স্তম্ভিতভাবে পুরাটা শুনে গেল ।এই অদ্ভুত ঘটনা কতোটা বিশ্বাসযোগ্য তা কেউ বুঝে উঠতে পারছে না। হঠাৎ প্রচণ্ড অট্টহাসি হাসতে শুরু করলাম আমি। বুক ভরা শান্তির সেই অট্টহাসি। আমার শরীরের প্রায় সমগ্রটাই তখন ওই 'ঝাপ' এবং প্লাস্টারের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। প্রচণ্ড ভরসা, নিরাপত্তাবোধ আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়কে গ্রাস করেছে। আমি এখন জগতের মায়ার ঊর্ধ্বে। আমি মুক্তি পেয়েছি। পৃথিবীর পঙ্কিলতা থেকে আমাকে চিরস্থায়ী মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

বাহ্যিক যন্ত্রণার শেষ সীমায় এসে এক স্নিগ্ধ, মাতৃজঠরের মতো নিরাপত্তা আমাকে গ্রাস করল। আমি শুনলাম, মাটির গভীরে অসংখ্য শাখা-প্রশাখা যেন একসঙ্গে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। এটাই মুক্তি—এই মাটির বাঁধনে, এই আদিম জৈবিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে।