নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
রাজধানীতে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে রাতভর হাত-পা বেঁধে হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে এবং ইলেকট্রিক শক দিয়ে সমস্ত টাকা-পয়সা, ব্যাংক কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন নম্বর লুটে নেওয়ার এক লোমহর্ষক ও নৃশংস ঘটনা ঘটেছে।
শুধু টাকা লুটে ক্ষান্ত হয়নি অপরাধী চক্রটি, ভুক্তভোগীকে হাসপাতালে ও পরে অন্য বাসায় জিম্মি করে রেখে তার পরিবারের কাছে ৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং তার সন্তানকেও আটকে রাখার পরিকল্পনা করে। বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ওই ব্যবসায়ী জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন।
গত ৮ই জুন রাজধানীর তেজগাঁও কাদিয়ানী মসজিদ এলাকার একটি বাসায় এই ঘটনা ঘটে বলে ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীর স্ত্রী ফৌজিয়া সুলতানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বরাতে জানান , কয়েকদিন আগে তার ব্যবসায়ী স্বামী ব্যবসার মালামাল কিনতে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আসেন। পূর্বপরিকল্পিতভাবে একটি অপরাধী চক্র তাকে অপহরণ করে তেজগাঁও কাদিয়ানী মসজিদ এলাকার একটি বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে একটি চেয়ারের সাথে বেঁধে, সারা গায়ে মোটা কাপড় পেঁচিয়ে লাইট বন্ধ করে হকিস্টিক দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো শুরু করে। তার কাছে থাকা নগদ মোটা অঙ্কের টাকা, মানিব্যাগ ও ফোন কেড়ে নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ফোনের পাসওয়ার্ড, চারটি ব্যাংক কার্ডের পিন এবং বিকাশ ও নগদের পিনের জন্য তার ওপর চালানো হয় তীব্র ইলেকট্রিক শক। চোখ-মুখ বেঁধে দফায় দফায় ইলেকট্রিক শক দেওয়ার একপর্যায়ে ওই ব্যবসায়ী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফিরলে আবারো পিনের জন্য শুরু হতো নির্যাতন। রাত ১১টা থেকে পরদিন সকাল ৭টা পর্যন্ত একটানা এই পাশবিক নির্যাতন চলে এবং এর মধ্যেই চক্রটি ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা সরিয়ে নেয়।
সকালে শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে সকাল ৭:৫৬ মিনিটে অপরাধীরা তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রেখে আসে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর চক্রের প্রধান দুজন সদস্য নিজেদের ‘রোগীর ভাই’ পরিচয় দিয়ে তাকে জোরপূর্বক হাসপাতাল থেকে বের করে বসিলার একটি বাসায় নিয়ে আবারো আটকে রাখে। সেখান থেকে ভুক্তভোগীর স্ত্রীর কাছে ফোন করে পুলিশে যেতে নিষেধ করা হয় এবং সন্তানসহ ৫ লক্ষ টাকা নিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে হাজির হতে বলা হয়। অন্যথায় তার স্বামীকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।
কোনো উপায় না দেখে ভুক্তভোগীর স্ত্রী ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানায় বিষয়টি অবহিত করেন। পুলিশে খবর দেওয়ার বিষয়টি টের পেয়ে অপরাধী চক্রটি ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কিছু হাতে লেখা স্ট্যাম্প বা ডকুমেন্টে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এরপর সন্ধ্যার পর ধানমন্ডি এলাকায় তাকে রাস্তায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে বাসায় এবং পরে ময়মনসিংহে নিয়ে যায়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আসামিরা মূলত টাকার লোভেই প্রায় এক মাস আগে থেকে এই ছক সাজিয়েছিল। এজন্য ভুক্তভোগীর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে কিছু ফেক আইডিও তৈরি করা হয়েছিল। অপরাধী চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা এবং অনলাইন জুয়ায় আসক্ত এবং তারা নিয়মিত এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে আসামিদের ছবি, ফেসবুক আইডি এবং সমস্ত প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "ও এখন খুবই অসুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে কিনা জানি না। টাকার জন্য ওরা আমার বাচ্চাটাকেও আটকে ফেলার প্ল্যান করেছিল। আমি আমার স্বামীর সুচিকিৎসা ও এই নৃশংসতার বিচার চাই। প্রয়োজনে আমি গণমাধ্যম ও টেলিভিশনের দ্বারস্থ হব।"
এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।