"হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে কেবল তেল নয়, খাদ্য ও সারের সংকটও অনিবার্য" বললেন আইএমএফের সাবেক প্রথম ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রথম ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর গীতা গোপীনাথ সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে চলমান জ্বালানি সংকট কেবল তেলের দামে সীমাবদ্ধ নেই — এটি এখন খাদ্য, সার ও আর্থিক স্থিতিশীলতাকেও গ্রাস করছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, এই সংকটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে বাংলাদেশসহ বিশ্বের স্বল্প আয়ের দেশগুলো।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরান-মার্কিন-ইসরাইল সামরিক সংঘাতের পর থেকে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। বিশ্বের সমুদ্রপথে জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা একে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংকটের শুরুতেই ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮০-৮২ ডলার থেকে ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
গোপীনাথ ফরেন পলিসি লাইভ-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এই সংকট ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের চেয়েও বড় ধাক্কা। আইএমএফ ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.১ শতাংশে নামিয়েছে। যদি হরমুজ প্রণালীতে জ্বালানি প্রবাহ আগামী বছর পর্যন্ত পুনরুদ্ধার না হয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নামতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে যা সাম্প্রতিক দশকগুলোতে একটি বিরল ঘটনা হবে।

তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে এই সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর 'থ্রি-এফ শক' — অর্থাৎ জ্বালানি (Fuel), খাদ্য (Food) ও সার (Fertilizer) এই তিনটি খাতে একসঙ্গে আঘাত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে কেবল তেল-গ্যাস নয়, সার ও শিল্পপণ্যও পরিবহন হয়। এখন দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় সার সরবরাহ কোনোমতে চলছে, কিন্তু অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে সার পাওয়াই অসম্ভব হয়ে যাবে। তাঁর ভাষায়, "তখন আর সরবরাহই পাবেন না এটাই বড় ক্ষতি।"
গোপীনাথ আরও সতর্ক করেন যে এই সংকট আর্থিক বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদি আর্থিক শর্ত আরও কঠিন হয়ে যায় যেমন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে উন্নয়নশীল দেশ থেকে পুঁজি সরিয়ে নেন- তাহলে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে পড়বে। তিনি বলেন, "এই জ্বালানি সংকট কতটা বড় আকার নেবে তা নির্ভর করছে মূলত আর্থিক শর্তগুলো কতটা কঠিন হয় তার উপর — এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"
সংকটের প্রভাব বিশ্লেষণে গোপীনাথ স্পষ্ট করেন যে সরাসরি সংঘাতে জড়িত দেশগুলোর বাইরে জ্বালানি আমদানিকারক ও দরিদ্র দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ এসব দেশের সরকারের কাছে ভর্তুকি দেওয়ার আর্থিক সক্ষমতা নেই, মুদ্রার অবমূল্যায়নের চাপ বাড়ছে এবং ঋণ সংকটে থাকা দেশগুলো নতুন ঋণ পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকট বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। দেশটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর, ইতিমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপে ভুগছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষিতে সার সংকট এবং শিল্প কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি মিলিয়ে এই বৈশ্বিক ধাক্কা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে আঘাত হানতে পারে।
গোপীনাথ দেশগুলোকে পরামর্শ দিয়েছেন আর্থিক সংযম বজায় রাখতে, বিকল্প জ্বালানি উৎস সন্ধান করতে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে। তিনি আরও জানান, সংকট স্বল্পমেয়াদে সমাধান হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে ক্ষতি মাত্র ০.৩ শতাংশ হবে, কিন্তু দীর্ঘায়িত হলে পুরো বিশ্ব মন্দার মুখে পড়তে পারে এবং সেই মন্দার সবচেয়ে নিষ্ঠুর শিকার হবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো।
"এই সংকট কেবল জ্বালানির সংকট নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সংকট। এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রভাব সবার জন্যই বিপদ ডেকে আনছে, কিন্তু সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে সেই দেশগুলো যারা আগে থেকেই আর্থিক দুর্বলতায় ভুগছে।" গীতা গোপীনাথ
ক্রাইম ক্রনিকল | সূত্র: ফরেন পলিসি লাইভ, ইন্ডিয়া টুডে টিভি, আইএমএফ।