স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল


গতকাল (১৮ মে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স (CCD) একটি ব্যতিক্রমধর্মী Praxis Classroom আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল— “হাঁর হঁমতা, হাঁর হঁষ্ট (Whose Power, Whose Pain): মিয়ানমার ও জলসীমান্তের জটিল বাস্তবতা”। আয়োজনে সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আরাকান আর্মির হাতে আটক হয়ে পরবর্তীতে দেশে ফিরে আসা জেলে মোহাম্মদ আমিনের (২৩) নিজের মুখে বন্দিজীবনের নির্মম অভিজ্ঞতার বর্ণনা।


সেন্টমার্টিন-এর বাসিন্দা মোহাম্মদ আমিন পেশায় একজন জেলে। ২০২৫ সালের আগস্টে সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে তিনি মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি-র হাতে আটক হন। তিনি বলেন, “বন্দিদশায় প্রতিটি দিন যেন এক বছরের চেয়েও দীর্ঘ মনে হতো।”


তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি মাছ ধরার সময় তাদের তিনটি ট্রলারসহ আটক করা হয়। অস্ত্র তাক করে সবাইকে হাত তুলতে বাধ্য করা হয়, এরপর হাত-পা ও চোখ বেঁধে ফেলা হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। ট্রলারের মধ্যেই লাথি ও লাঠির আঘাতে কয়েকজনের মাথা গুরুতরভাবে আহত হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে তাদের আরাকান উপকূলের একটি ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে শুরু হয় দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ ও অমানবিক নিপীড়ন।


মোহাম্মদ আমিন জানান, আটক জেলেরা কান্না করলেও তাদের ওপর আরও নির্যাতন চালানো হতো। অন্ধকার পাহাড়ি অঞ্চলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মারধর করা হতো। তিনি দাবি করেন, তাদের চোখের সামনেই দুইজন রোহিঙ্গাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নির্যাতনের এক পর্যায়ে বাংলাদেশি জেলেদের বাধ্য করা হয় স্বীকার করতে যে তারা মিয়ানমারের জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন।


তিনি আরও বলেন, প্রায় এক মাস ১৫ দিন লোহার শিকলে বেঁধে রাখার পর তাদের আদালতে নেওয়া হয় এবং পরে একটি গোপন সেলে বন্দি রাখা হয়। খাবার বা পানি চাইলে বলা হতো, “বাংলাদেশে গিয়ে পানি খেয়ো।” পরে হঠাৎ করেই জানানো হয়, সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে তাদের ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।


বন্দিজীবনের ভয়াবহ স্মৃতি তুলে ধরতে গিয়ে এখনও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মোহাম্মদ আমিন। তিনি বলেন, “১০৬ জন বন্দি জেলেকে মাত্র দুটি কক্ষে রাখা হয়েছিল। যে খাবার দেওয়া হতো, তা আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল ছিল। ক্ষুধার তাড়নায় আমরা ঘাস খেতাম, কিন্তু সেটির জন্যও আমাদের মারধর করা হতো।”


তিনি আরও জানান, কোনো বন্দি মারা গেলে তার মরদেহ একটি কম্বলে মুড়ে পাহাড়ের পাশে ফেলে রাখা হতো। প্রচণ্ড শীতে মাত্র একটি কাপড় পরে চার মাস কাটাতে হয়েছে তাদের। “আমরা পানি দিয়ে ভাত নরম করে খেতে চাইলে আমাদের পানি দেওয়া হতো না। তারা বলত, ‘পানি দিলে তোমাদের শক্তি বাড়বে, তখন তোমরা পালিয়ে যাবে।’”


মোহাম্মদ আমিনের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি আরাকান আর্মি তাদের একটি তালিকা তৈরি করে। দুই দিন পর বন্দিদের জানানো হয় যে বাংলাদেশ সরকার তাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী নয়; তবে রমজান উপলক্ষে মানবিক কারণে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। একইসঙ্গে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, ভবিষ্যতে এই সীমান্তে এলে ২২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে।


অবশেষে চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৭৩ জন বাংলাদেশি জেলেকে মুক্তি দেয় আরাকান আর্মি। মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ আমিনও। তবে দেশে ফেরার পথে ট্রলারে বসেই তিনি জানতে পারেন, বন্দিদশায় থাকা অবস্থায় তার বাবা মারা গেছেন। এই খবর শুনে তিনি ট্রলারেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন।


আমিন বলেন, “তিন মাস ঘাস খেয়ে বেঁচে ছিলাম। ইঁদুর আমাদের খাবার খেয়ে ফেলত, আমরা অবশিষ্টটুকু কুড়িয়ে খেতাম। এখনও অনেক বাংলাদেশি জেলে সেখানে আটকা পড়ে আছেন।” তিনি আরও জানান, নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ না করতে আরাকান আর্মি হুমকি দিয়ে বলেছিল— “তোমরা মুখ খুললে বাকি জেলেদের মেরে ফেলব।”


সরকারের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে মোহাম্মদ আমিন বলেন, “আমরা যখন ফিরেছি, তখন শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ ছিলাম। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে কোনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়নি। কেউ আমাদের খোঁজও নেয়নি। আমার নিজের এখন ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা ঋণ। মাছ ধরতে পারছি না, পর্যটনও নেই—জীবন কীভাবে চলবে জানি না।”