নিজস্ব প্রতিবেদক, ক্রাইম ক্রনিকল 


স্বনামধন্য ব্যবসায়ী আশরাফ মারওয়ান ছিলেন মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের মেয়ে মুনা নাসেরের জামাই। এছাড়াও তিনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সিনিয়র উপদেষ্টা। তবে মি. মারওয়ান যে কারণে আরব বিশ্বে বহুল আলোচিত সেটি হলো, তিনি ছিলেন ইসরায়েলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একজন গুপ্তচর। কিন্তু বাজারে জোর গুঞ্জন চালু আছে যে তিনি ছিলেন মুলত মিশরের ডাবল এজেন্ট। মিসর-ইজরায়েল দুই দেশই আশরাফ মারওয়ানকে তাদের নিজেদের বলে দাবি করে।


১৯৬৮ সালে আশরাফ মারওয়ান প্রেসিডেন্ট নাসেরের মেয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন। বিয়ের পর তাকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে উচ্চ গোয়েন্দা ছাড়পত্রে নিযুক্ত করা হয়। পরের বছরই তিনি সস্ত্রীক লন্ডনে চলে যান রসায়নে উচ্চতর শিক্ষার জন্য। ১৯৭০ সালের দিকে মারওয়ান লন্ডনে ইসরায়েলি দূতাবাসে যোগাযোগ করে গুপ্তচরবৃত্তি করার প্রস্তাব দেন। ঠিক ঐ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট নাসেরের মৃত্যু হয়। ক্ষমতায় বসেন আনোয়ার সাদাত। ১৯৭০ সালের শেষের দিকে মারওয়ান মোসাদকে তথ্য সরবরাহ করা শুরু করেন। তার কাছে থাকা লিখিত, নির্ভরযোগ্য ও গোপনীয় নথি সরবরাহ করে ইসরায়েলিদের অবাক করে দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, মিশরীয় সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে তার আয়ত্তে থাকা বিভিন্ন কৌশলগত তথ্যের বিশাল ভান্ডার থেকে কেবল ছোট্ট নমুনা দেখানো হয়েছে। মোসাদের কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, মিশর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার যেকোনো অভিপ্রায় সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা পাঠাতে প্রস্তুত তিনি।


১৯৭৩ সালের অগাস্টে লিবিয়া কর্তৃক এল আল বিমান (El Al aircraft) ভূপাতিত করার নীলনকশা জনাব মারওয়ান ইসরায়েলিদের জানিয়ে দেয়। যার ফলে মোসাদের কাছে মারওয়ানের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তিনি আবার মোসাদকে জানান এবছরের শেষেই সিরিয়া ও মিশরের যৌথ উদ্যোগে ইসরায়েলের উপর অতর্কিত আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছে। 


এরপরই ১৯৭৩ সালের ৪ অক্টোবর দুই দিনের আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে রাত ১০:৩০ এ মারওয়ান যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে তথ্য জানানোর জন্য মোসাদের প্রধানের সাথে জরুরি বৈঠকের আহ্বান করেন। পরদিন ৫ অক্টোবর রাত ১১:৪৫ এ মোসাদের প্রধানের সাথে লন্ডনের বৈঠকে তিনি জানান, ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬:০০ টার দিকে একটি বড় আকারের মিশরীয় আক্রমণ শুরু হবে। দিনটি ছিল ইহুদিদের পবিত্র দিন ইয়ম কিপুর। কিন্তু বাস্তবে মিসর আক্রমণ করেছিল এর চার ঘন্টা আগে, দুপুর ২:০০ টার সময়।


বলা হয়, ঐ যুদ্ধের সংবাদ ১৫ ঘন্টা আগে ইসরায়েলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কারণেই সে যাত্রা ইসরায়েল পুরোপুরি রক্ষা পেয়ে গিয়েছিল। তা না হলে হয়তো ইসরায়েলের অস্তিত্বই বিপন্ন হতো। তৎকালীন মোসাদ প্রধান জাভি জামির তাকে ইজরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা উৎস হিসেবে নিশ্চিত করেন।


আবার মারওয়ানের দেয়া তথ্যের চার ঘন্টা আগে মিশরীয়-সিরীয় আক্রমণ শুরু হওয়ায় ইসরায়েল প্রথম দিকে কোনে প্রতিরোধই তৈরি করতে সক্ষম হয়নি। যুদ্ধের প্রথম দিকে মিশরের সৈন্যরা প্রায় বিনা বাধায় সুয়েজ খাল এবং সিনাই উপদ্বীপের বিশাল অংশ মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। এই যুদ্ধের ফলে ইসরায়েলকে হারাতে হয়েছে মিশরের সিনাই উপদ্বীপের দখল, যেটা তারা ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে মিশরের কাছ থেকে দখল করে নিয়েছিল। এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইজরায়েলের অতি আত্মবিশ্বাসে আঘাত লাগে এবং মিশরের কয়েক দশকের লজ্জার ইতিহাসে যুক্ত হয় গৌরবের এক অধ্যায়।


১৯৭৩ সালের চতুর্থ আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ তথা ইয়ম কিপুর (Yom Kippur) যুদ্ধে ইজরায়েলের গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় নিয়ে ইজরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (Aman)-এর তৎকালীন প্রধান এলি জেইরা এবং গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ (Mossad)-এর তৎকালীন প্রধান জাভি জামিরের মধ্যে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়। জাভি জামির জনসমক্ষে অভিযোগ করেন যে, এলি জেইরা ইচ্ছাকৃতভাবে গণমাধ্যমের কাছে ইজরায়েলের সেরা গুপ্তচর আশরাফ মারওয়ানের আসল পরিচয় ফাঁস করে দিয়েছেন। এই মানহানির অভিযোগের বিরুদ্ধে এলি জেইরা ২০০৪ সালে একটি মামলা করেন।


দীর্ঘ শুনানির পর ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি থিওডোর এই মামলার রায় প্রদান করেন। ২০০৭ সালের মে মাসে তিনি চূড়ান্ত রায়ে বলেন, জেনারেল এলি জেইরা গণমাধ্যমে মোসাদের শীর্ষ এজেন্ট আশরাফ মারওয়ানের আসল পরিচয় ফাঁস করেছিলেন। আদালত জেইরার মানহানির মামলা খারিজ করে দেয় এবং তাকে উল্টো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে এই রায়ের মাধ্যমে ইসরায়েলি আদালত পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেয় যে, মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্টের জামাতা ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী আশরাফ মারওয়ান আসলেই মোসাদের হয়ে কাজ করতেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা গণমাধ্যমের গুঞ্জন এই রায়ের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি স্বীকৃতি পায়।


আদালতের এই রায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের মাত্র ১৩ দিন পর, ২০০৭ সালের ২৭ জুন, আশরাফ মারওয়ান লন্ডনে তাঁর নিজ ফ্ল্যাটের ব্যালকনি থেকে রহস্যজনকভাবে নিচে পড়ে মারা যান। অনেকেই ধারণা করেন, ইসরায়েলি আদালতের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল।


২০০৭ সালের পহেলা জুলাই মিশরের কায়রোতে হেলিওপোলিস এলাকায় অবস্থিত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের পাশের একটি মসজিদে আশরাফ মারওয়ানের রাষ্ট্রীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশগ্রহণ করেন মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের ছেলে জামাল মুবারক, গোয়েন্দা প্রধান ওমর সুলেমানসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। জানাজায় ইমামতি করেন আল-আজহারের তৎকালীন গ্র্যান্ড ইমাম মুহাম্মদ সাইয়িদ তানতাউই। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার কফিন মিশরের পতাকায় আবৃত ছিল এবং রাষ্ট্রীয় নায়কের সম্মানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরদিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক তাকে "দেশপ্রেমিক" হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।