আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল


গত ২৬ মে গোলামরেজা খানি শেকারাবকে ফাঁসি দিয়েছে ইরান। এর আগে ১১ মে ফাঁসি হয় ২৯ বছর বয়সী অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার এরফান শাকুরজাদেহর। অভিযোগ দুটিতে এক সুর: সিআইএ ও মোসাদের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি। ইরানের জন্য এ ধরণের মৃত্যুদণ্ড নতুন কিছু না। কিন্তু যা পুরো ঘটনার চরিত্র বদলে দিয়েছে, তা ঘটেছিল গতবছর— ২০২৫ সালে।


সেই সময় ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও ওএসআইএনটি বিশ্লেষকরা একের পর এক ভিডিও প্রকাশ করে। দেখা যায়, ইরানের ভেতরে মোসাদের স্লিপার সেল বহু বছর ধরে সক্রিয়। কেউ প্রযুক্তি খাতে, কেউ বেসরকারি চাকরিতে, কেউ সাধারণ মানুষের বেশে। ড্রোন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সামরিক অবকাঠামো টার্গেট করতে প্রস্তুত ছিল তারা।



ইরানের মাটিতে পরিচালিত মোসাদ এজেন্টদের অভিযানের ফুটেজ, জুন ২০২৫। (ছবি: israelhayom)


এখন প্রশ্ন হলো: ২০২৫ সালের সেই ভিডিও আর ২০২৬ সালের এই ফাঁসি - এদের মধ্যে সম্পর্কটা কী?


ইরান বহু বছর ধরে বলে আসছে - আমাদের ভেতরে বিদেশি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সক্রিয়। পশ্চিমা বিশ্বের বড় অংশ সেটাকে ‘রাজনৈতিক প্রচারণা’ বলেই উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালে ইসরায়েল যখন নিজেরাই ভিডিও প্রকাশ করে ফেলল, তখন সেই ‘প্রচারণা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ শেষ হয়ে যায়। ইসরায়েল অজান্তেই ইরানের সবচেয়ে বড় দাবিটির সত্যতা প্রমাণ করে দেয়।


এটাই সবচেয়ে বড় অস্বস্তিকর সত্য। কোনো পক্ষই পুরোপুরি মিথ্যা বলতে পারে না। উল্টো, তারা পরস্পরের সত্যকে শক্তিশালী করছে।


অবশ্য ইসরায়েলের এই ভিডিও প্রকাশের নিজস্ব কৌশল আছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ব্যাপক সমালোচিত হয়। ‘এত বড় হামলার আভাস এল কোথায়?’ - এই প্রশ্নের জবাব দিতেই তারা ২০২৫ সালে একের পর এক অপারেশনের তথ্য ফাঁস করে। ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’, স্লিপার সেল, ড্রোন ফুটেজ— সবকিছুর এক বার্তা: আমাদের ক্ষমতা হারায়নি, নজরদারি এখনও শক্তিশালী। কিন্তু এখানে ইসরায়েলের অর্জন সীমিত বলেই আমরা বুঝতে পারি।


গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ মানে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নয়। ড্রোন ঘাঁটি ধ্বংস মানে রাষ্ট্র ভেঙে পড়া নয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে আছে, আইআরজিসি সক্রিয়, আঞ্চলিক প্রভাব এখনও বলবৎ। তাই এই সংঘাতকে ‘ছায়াযুদ্ধ’ বলা হয় - দুই পক্ষই আঘাত করে, দুই পক্ষই জয় দাবি করে, কিন্তু কেউ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারে না।


তবে ২০২৬ সালের মে মাসের এই দুই ফাঁসি আর ২০২৫ সালের মোসাদের ভিডিও মিলে একটি অদ্ভুত চিত্র তৈরি করে দিয়েছে। একদিকে ইরান বলছে, ‘দেখো, আমরা গুপ্তচরদের শাস্তি দিচ্ছি।’ অন্যদিকে ইসরায়েলের ভিডিও আগেই বলে দিয়েছে, ‘হ্যাঁ, সেসব গুপ্তচর ছিল।’ অর্থাৎ ইরান যা বলত, তা এক সময় ‘প্রপাগান্ডা’ ছিল - আজ সেটি ‘ডকুমেন্টেড ফ্যাক্ট’ হয়ে গেছে।


এখানে উভয় পক্ষই পরস্পরের সত্যকে শক্তিশালী করে দিচ্ছে। ইসরায়েল প্রমাণ করেছে ইরানের অভিযোগ সঠিক। আর ইরান প্রমাণ করেছে সেই গুপ্তচরদের বিরুদ্ধে তাদের বিচার কেবল রাজনীতি নয়।


ছায়াযুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরাজয় হয় স্পষ্টতার জায়গায়। যেখানে কোনো পক্ষই পুরোপুরি মিথ্যা বলতে পারে না। আর সেখানেই দাঁড়িয়ে এই পুরো ঘটনা আমাদের এক অস্বস্তিকর জায়গায় ফেলে দেয়। দুই প্রতিপক্ষ পরস্পরকে হারানোর চেষ্টায় গিয়ে পরস্পরের বক্তব্যকেই বৈধতা দিচ্ছে। আর সেই বিদ্রূপ হয়তো এই ছায়াযুদ্ধের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।