নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে অনুমোদন পেল দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগের গেম চেঞ্জার ও বহুল আলোচিত ‘পিএবি-টইটং মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প’। ৯ জুন (মঙ্গলবার) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রায় ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
‘আনোয়ারা-বাঁশখালী-টইটং-পেকুয়া-বদরখালী-চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’ নামের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব এক ধাক্কায় ৪০ কিলোমিটার কমে যাবে। ফলে বাঁচবে অন্তত এক ঘণ্টার মূল্যবান সময়। ২০৩০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্ণফুলী (বঙ্গবন্ধু) টানেলকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলতে এই মহাসড়কটি লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে। টানেল চালুর পরও কক্সবাজার ও মাতারবাড়ীর সাথে দ্রুত যোগাযোগের উন্নত সড়ক নেটওয়ার্ক না থাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বিকশিত হতে পারছিল না।
এই সড়কটি নির্মিত হলে আনোয়ারা, বাঁশখালী, চকরিয়া, মহেশখালী ও কক্সবাজারকে ঘিরে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা ও বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সাথে, এই বিকল্প মহাসড়কের কারণে কর্ণফুলী টানেলে যানবাহন চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ফলে টানেলের রাজস্ব আয় বাড়বে এবং লোকসান ও পরিচালন ব্যয় কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে কর্ণফুলী টানেল হয়ে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরে যেতে পটিয়া বাইপাস ও গাছবাড়িয়া হয়ে প্রায় ১৩১ কিলোমিটার পথ ঘুরতে হয়। নতুন প্রকল্প চালু হলে যানবাহনগুলো টানেল থেকে বের হয়ে কালাবিবির দীঘি-বাঁশখালী-টইটং-পেকুয়া হয়ে সরাসরি মাতারবাড়ী পৌঁছাতে পারবে। এতে দূরত্ব কমবে ৪০ কিলোমিটার এবং সময় বাঁচবে ১ ঘণ্টা।
অন্যদিকে কক্সবাজারগামী যানবাহনগুলো এই রুট ব্যবহার করলে আগের চেয়ে প্রায় ২৮ কিলোমিটার পথ কম অতিক্রম করতে হবে এবং প্রায় ৪৫ মিনিট সময় সাশ্রয় হবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কালাবিবির দীঘি থেকে মাতামুহুরী (ঈদমনি) পর্যন্ত প্রায় ৫৮ দশমিক ২০ কিলোমিটার সড়ক এই প্রকল্পের আওতায় উন্নয়ন ও প্রশস্ত করা হবে। বর্তমানে এই সড়কের অনেক অংশের প্রস্থ মাত্র ১৮ ফুট, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ৩৪ ফুটে উন্নীত হবে।
বর্তমানে আনোয়ারার কালাবিবির দীঘির মোড় থেকে বাঁশখালীর চাঁনপুর বাজার পর্যন্ত ১০০ ফুট ভূমি অধিগ্রহণ করা আছে। তবে চাঁনপুর বাজার থেকে চকরিয়া পর্যন্ত সড়ক অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় নিত্যদিনের যানজট ও দুর্ঘটনা এখন নিয়মিত বিষয়। সড়কটি ৩৪ ফুটে উন্নীত হলে দুর্ঘটনা ও যানজট অনেকাংশে কমে আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় এক বছর আগেই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পুনর্মূল্যায়ন এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এর অনুমোদন প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্বিত হয়। অবশেষে এই অনুমোদনের মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও দাবির বড় অগ্রগতি হলো।
প্রকল্পের বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, "পিএবি-টইটং সড়ক দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের বহু প্রতীক্ষিত একটি প্রকল্প। এটি বাস্তবায়িত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।"
একই বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল নোমান পারভেজ বলেন, "দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। এটি এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে এবং কোটি মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"
বাঁশখালীর স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যাংক কর্মকর্তা ইনজামামুল হক নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, "টানেল চালুর পরও আমাদের কক্সবাজার যেতে ঘুরপথ ব্যবহার করতে হতো। এই সড়কটি হলে আমাদের সময় ও অর্থ দুই-ই বাঁচবে। টানেল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক হাব গড়ে তোলার স্বপ্ন এবার সত্যি হতে চলেছে।"