নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
ঈদুল আজহা সামনে রেখে দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে—এমন দাবি করেছেন প্রবাসী কল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তবে শিল্পাঞ্চল পুলিশের পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধে অনিয়ম ও বকেয়া রয়ে গেছে।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সিলেট কেন্দ্রীয় শাহী ঈদগাহে ঈদের জামাতের প্রস্তুতি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী বলেন, “৯৯ শতাংশ শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ সম্পন্ন হয়েছে।” তবে তিনি দাবি করেন, বিচ্ছিন্ন কিছু কারখানা ছাড়া বড় কোনো সমস্যা নেই।
অন্যদিকে শিল্পাঞ্চল পুলিশের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, এখনো অন্তত ১,৫০০টি কারখানায় ঈদ বোনাস পরিশোধ হয়নি, যার মধ্যে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতেই রয়েছে প্রায় ৪০৯টি কারখানা। একই সঙ্গে ১৬২টি কারখানা এখনো এপ্রিল মাসের বেতন পরিশোধ করেনি, যার মধ্যে বড় অংশই গার্মেন্টস খাতের।

কারখানায় কাজ চলমান। ছবি: সংগৃহীত
বিজিএমইএ ও শিল্পাঞ্চল পুলিশের তথ্যেও রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। বিজিএমইএ দাবি করছে, তাদের আওতাধীন অধিকাংশ কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ হয়ে গেছে, আর বকেয়া রয়েছে হাতে গোনা কিছু কারখানায়। অন্যদিকে শিল্পাঞ্চল পুলিশের হিসাবে বকেয়া কারখানার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
এই বাস্তবতার মধ্যেই সবচেয়ে বড় শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে। কুমিল্লা-৯ আসনের বিএনপি সমর্থিত সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের মালিকানাধীন চৈতি গ্রুপের দুটি পোশাক কারখানায় বেতন, ঈদ বোনাস ও আর্নড লিভের টাকা পরিশোধের দাবিতে শ্রমিকরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন।

ঢাকা - চট্রগ্রাম মহাসড়কে শ্রমিকদের বেতন বোনাসের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ
মঙ্গলবার দুপুরে টিপুরদী এলাকায় শত শত শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নিলে মেঘনা টোল প্লাজা থেকে মদনপুর পর্যন্ত প্রায় ৮–১০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এতে দূরপাল্লার বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সসহ হাজার হাজার যানবাহন আটকে পড়ে। ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পূর্ণ বেতন ও ঈদ বোনাস দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের আংশিক টাকা দেওয়া হয়েছে। অনেকের দাবি, মোট পাওনার বড় অংশ এখনো বাকি।
আন্দোলনরত এক নারী শ্রমিক বলেন, “ঈদের আগের দিন রাস্তায় নামতে হবে—এটা আমাদের জন্য কষ্টের, কিন্তু বাধ্য হয়েছি।”
তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, নিয়মিত বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে এবং মূলত আর্নড লিভের টাকার দাবিতে আন্দোলন হয়েছে।
খবর পেয়ে সোনারগাঁ থানা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়া হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। পরে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
ঈদের আগে সরকারের “৯৯ শতাংশ পাওনা পরিশোধ” দাবির বিপরীতে শিল্পাঞ্চল পুলিশের শতাধিক কারখানায় বকেয়া থাকার তথ্য এবং চৈতি গ্রুপের মতো ঘটনায় শ্রমিক অসন্তোষ—সব মিলিয়ে শ্রম খাতের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।