আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল

গ্যাং সহিংসতায় জর্জরিত হাইতিতে এবার অপহরণের শিকার হয়েছেন দেশটির অন্যতম শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিপরিষদ পরিচালক এবং জাতীয় পুলিশের মহাপরিদর্শক জেমস বোয়ার্ডকে রাজধানী পোর্ট-অব-প্রিন্স থেকে সশস্ত্র ব্যক্তিরা অপহরণ করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাজধানীর বুরদোঁ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে পোর্ট-অব-প্রিন্সের তুলনামূলক নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাং সদস্যরা সেই এলাকাতেও তাদের তৎপরতা বিস্তার করেছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

জেমস বোয়ার্ড হাইতির সশস্ত্র বাহিনী পুনর্গঠন এবং জাতীয় পুলিশে সংস্কার কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবেও তিনি পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপহৃত হওয়া উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে মনে করা হচ্ছে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মুক্তিপণ দাবি করা হয়নি এবং কোনো গোষ্ঠীও অপহরণের দায় স্বীকার করেনি। হাইতির কর্তৃপক্ষও তার মুক্তির প্রচেষ্টা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

সংকট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এত উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তাকে অপহরণ করা অত্যন্ত পরিকল্পিত অভিযানের ইঙ্গিত দেয়। আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষণ সংস্থার গবেষক দিয়েগো দা রিন বলেন, জেমস বোয়ার্ডের মতো কর্মকর্তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাধারণত কঠোর হয়ে থাকে। ফলে অপহরণটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে এবং এতে তার নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরের কারও সহযোগিতাও থাকতে পারে।

তার মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গ্যাং সদস্যরা নিরাপদ এলাকাগুলোতেও অপহরণ অভিযান চালাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা পুলিশের পোশাক ব্যবহার করে ভুয়া চেকপোস্ট স্থাপন করে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।



গত ১ অক্টোবর, ২০২৫ হাইতির রাজধানী পোর্ট-অব-প্রিন্সের ন্যাশনাল প্যালেস সংলগ্ন নগরীর কেন্দ্রস্থলে টহলরত হাইতিয়ান সেনাদল (FADH)। (ছবি: এএফপি)


বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পোর্ট-অব-প্রিন্সের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হচ্ছে ভিভ আনসাম নামের একটি জোট, যাকে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি গ্যাংগুলো দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ব্যক্তি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করছে। এর মাধ্যমে তারা একদিকে বেশি অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান ঠেকাতে চাপ সৃষ্টি করছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে হাইতিতে অন্তত ২৬৭টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। আর ২০২৫ সালে মোট অপহরণের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৬৮টি।

যদিও আগের বছরের তুলনায় অপহরণের সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবু নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে অপহরণ বাড়া নতুন ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের মতে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখন শুধু অর্থ আদায় নয়, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপরও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

হাইতির চলমান নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে জেমস বোয়ার্ডের অপহরণ দেশটির রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ঘটনা প্রমাণ করছে যে রাজধানীর তুলনামূলক নিরাপদ এলাকাগুলোও এখন আর গ্যাং সহিংসতার বাইরে নেই।