পুতুল
তাসনিম হালিম মিম
ঈদের দিন তনিমা প্রথম আমার বাসায় এসেছিল। তাকে কি ভাবে আপ্যায়ন করা উচিত- বুঝতে পারছিলাম না।
প্রথমে তাকে সেমাই সাধলাম। খেতে আপত্তি না করলেও, দু-চামচ খেয়ে সে সেমাইয়ের বাটি ফিরিয়ে দিল। আরো নানা খাবারের নাম করলাম, সবগুলোই সে মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো। কুরবানির মাংস এখনো রান্না চলছে। টিভির সামনে তনিমাকে আর তার সামনে একটা বাদামের বাটি বসিয়ে আমি সরে পড়লাম। আমার কাজ আছে। কুরবানির ঈদের দিন বাসায় কাজের অন্ত থাকে না। কসাইদের তদারক করা, বিল্ডিং এর নিচ থেকে মাংস আনা, বন্টন করা, বাটা মাংস নিচে আবার পাঠানো অভাবীদের মাঝে বিতরণের জন্য, বাসার জন্য রাঁধা, ভুঁড়ি পরিষ্কার করা, আর সব কাজ শেষে পুরো বাসা ঝকঝকে পরিষ্কার করে রক্ত মাংসের গন্ধ মুছে ফেলা। এতো বড় কর্মযজ্ঞে আমাকে কদাচিৎ যুক্ত হতে হয়। এগুলো করার লোক আছে। মা আছে, ভাইয়া আছে, কাজের খালা আছে, আছে তনিমার মা।
তনিমার মা বছরের মূলত একটা দিনই আমাদের বাড়ি আসে। ঈদুল আযহার দিন, ভুঁড়ি পরিষ্কার করতে। এই একটা কাজে তার তিন-চার ঘণ্টা লেগে যায়। আরো দক্ষ লোক হয়তো কাজটা আরো দ্রুত করতে পারতো। কিন্তু আমরা অন্য লোক খুঁজি না। তনিমার মা জয়নব আমাদের কাজের খালার মেয়ে। ঈদের দিনে ভুঁড়ি পরিষ্কার উপলক্ষ্যে তার কিছু অতিরিক্ত উপার্জন হয়। জয়নব একটা গার্মেন্টসে চাকরি করে। জামায় বোতাম লাগায়। এইকাজের জন্য তাকে ঘন্টায় সাতাশ টাকা দেওয়া হয়। ভুঁড়ি পরিষ্কার শেষে পোলাও-মাংস খেয়ে সন্ধ্যাবেলায় সে যখন নিজ বাসায় ফিরতে যায়, মা তার হাতে চকচকে পাঁচশ টাকার একটা নোট তুলে দেয়। এই টাকা পেয়ে জয়নব চওড়া হাসি দিয়ে আম্মুকে কদমবুসি করে।
জয়নব এর আগের দুই ঈদে একাই এসেছে কাজে। এবার মেয়েকে নিয়ে আসার কারণ কয়েক মাস আগে তার স্বামী আরেকটা বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে। আগের ঈদগুলোতে মা কাছে না থাকলেও, বাবার সাথে সময় কেটে যেতো তনিমার। এখন ফাঁকা বাসায় ছয় বছরের বাচ্চা মেয়েকে রেখে আসা যায় না।
নিজের ঘরে ফিরে পড়াশোনায় ডুবে গিয়েছিলাম। সামনে গুরত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ঈদের দিনটায় পড়াশোনার বিরতি যেহেতু ক্ষমা করা যায়, সেজন্যই যেন আজকে আরো বেশি করে পড়তে মন চাইছে। মিনিট বিশেক কাটতে না কাটতেই তনিমার কণ্ঠ শুনতে পেলাম, সে তার মাকে সুর করে ডাকছে, ডেকেই যাচ্ছে। তবে ওর মায়ের হয়তো এখন জবাব দেওয়ার অবস্থা নেই। সে ভুঁড়ি, গরম পানি, ছুরি ইত্যাদি নিয়ে বাথরুমে মহাব্যস্ত। তনিমারও ধৈর্য্যের অভাব নেই। টিভির সামনে বসে ডেকে ডেকে মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। আমি কিছুক্ষণ এই সুরেলা শিশু কণ্ঠ শুনে, পড়ায় আর মন দিতে না পেরে বেরিয়ে এলাম। ড্রয়িংরুমের দরজায় গিয়ে দেখি সে কার্টুন গোপাল ভাঁড় দেখতে দেখতেই থেকে থেকে আপনমনে মা কে ডাকছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “অন্য কিছু দেখবে?” সে আমার দিকে তাকিয়ে ডানে-বায়ে মাথা নাড়ল।
আমি নিজের ঘরে ফেরত গিয়ে পড়ায় পুনরায় ডুব মারার চেষ্টা করলাম। দশ মিনিট যেতে না যেতেই তনিমার মাতৃ-আহ্বান শুনতে পেলাম। “মা, মা, মা…”। শিশু পরম আগ্রহের সাথে ডাকছে, তার মা পরম নির্লিপ্ততায় উপেক্ষা করছে। আরেকবার ঘর থেকে বেরোলাম। ড্রয়িংরুমে যাওয়ার আগে ওয়াশরুমে উঁকি দিলাম, যেখানে জয়নব ভুঁড়ি পরিষ্কার করছে। জয়নব পিড়িতে বসে মুখ নিচু করে একখন্ড নাড়ি চাকু দিয়ে চেঁছে পরিষ্কার করছিল। এইসময় তনিমার ডাক আরেকবার ভেসে এলো। জয়নব মুখ তুলে সামনে তাকালো, সেই মুহূর্তে তার জুলফি বেয়ে ঘামের রেখা নেমে এলো। ভেজা গলা আর শুকনো ঠোঁট দেখে বুঝলাম, সে তৃষ্ণার্ত। তবে ভুঁড়ি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ময়লা হাত পরিষ্কার করার ঝক্কি পোহায়ে পানি খাওয়ার ঝামেলায় যেতে চায় না। তনিমার আরেকটি মা ডাক শুনে সে ঢোক গিলে মাথা নামিয়ে চিকন চাকু নাড়িতে ঢোকানোতে ব্যস্ত হয়ে গেল। আমি তনিমার কাছে গিয়ে ওর পাশে বসলাম। আমার পঁচিশ বছরের জীবনে সম্ভবত এই প্রথম কোনো শিশুর সাথে যেচে সময় কাটানোর চেষ্টা।
শিশুরা বরাবরই দেখতে সুন্দর হয়, সেই হিসাবে তনিমা দেখতে চমৎকার। তার মা জয়নবের সাথে ঠোঁট ও নাকের মিল প্রবল। সুন্দর গোলাপী রঙয়ের ফ্রক পরে এসেছে। পোশাকের ঝকঝকে ভাব বুঝিয়ে দিচ্ছে আজ বছরের নতুন পোশাক পরার দিন। প্রশ্ন করে জানলাম, জামাটা ওর মা গতকাল সেলাই মেশিনে বসে বানিয়ে দিয়েছে। বুঝলাম, গার্মেন্টসে কাজ করা জয়নবের রুচি আর দক্ষতা দুইই আছে। তনিমা এখনো স্কুলে যায় না, পড়তেও পারে না। তাই ড্রয়িংরুমের বড় বুকসেলফের ভেতর থেকে খুঁজে-খুঁজে বের করা কিছু শিশুতোষ বই তাকে পড়তে দেওয়ার সদিচ্ছা ব্যর্থ হলো। তনিমাকে মুখ ফসকে ওর বাবার কথা জিজ্ঞেস করে ফেললাম। শিশুরা অপ্রস্তুত হয় না। সে খুশি মনে বাবার কথা বলতে লাগলো। ঈদের দিন বাবার সাথে ও অনেক মজা করে, দুপুরে বাবা খাইয়ে দেয়। বিকালবেলা বাবার ফুচকার দোকানে ওকে নিয়ে যায় মা, তখন বাবা তাকে পাশের ভ্যান থেকে কোণ আইসক্রিম কিনে দেয়। আজকেও বিকালে তারা বাবার সাথে দেখা করতে যাবে। বলতে বলতে তার সুন্দর মুখ যেভাবে গম্ভীর হয়ে ওঠলো, আমার মনে হলো, সে বুঝতে পেরেছে বাবার সাথে তার আজ দেখা হবে না।
তনিমাকে নিয়ে আমার ঘরে এলাম। যারা আমাকে চেনেন, তারা জানেন, এই কাজটা আমার প্রবলভাবে স্বভাববিরুদ্ধ। আমার ঘরে জনসাধারণ তথা বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের প্রবেশ একরকম নিষেধ। আমি আমার কোণে অতি নির্জন থাকতে পছন্দ করি। আজ এখানে একটা অপরিচিত মানুষের প্রবেশ শুধু যে অনুমোদন করলাম তা নয়, নিজেই বিষয়টা ঘটালাম। কারণটা সহজ। এই সুবেশ কিন্তু দরিদ্র, আত্মীয়পরিবেষ্টিত কিন্তু একাকী শিশুর ঈদের দিনটা পুরো মাটি হয়ে যাচ্ছে, এমনটা ভেবেই আমার ভারি অস্বস্তি হচ্ছিল। আর অস্বস্তি জিনিসটা বেশিক্ষণ সহ্য করা যায় না। তনিমা আমার ঘরে এসে মনোযোগ দিয়ে ঘরের সাজসজ্জা দেখতে লাগলো। ঘরের বারান্দায় তার কিছু সুন্দর ছবি তুলে দিলাম। বারান্দা-বাগানের সবুজের মধ্যে সে জ্বলজ্বল করছিল।ছবি তোলা শেষে ঘরে ফিরে মুশকিলে পড়লাম। শিশুর মন আকর্ষণ করা যায় এরকম কিছু আমার ঘরে নেই। শুধু আমার ঘরে কেন, আমাদের পুরো বাড়িতেও একটা খেলনা নেই। দীর্ঘদিন এই বাড়িতে কোনো শিশুর আনাগোনা না থাকায় খেলনা-পুতুলের এসবের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। বসার ঘরে যদিও কিছু শো-পিস আছে, তবে সেগুলো দেখারই জিনিস, খেলার নয়। বেশ কিছু ছবি টাঙানো ছিল আমার ঘরের দেয়ালে, তনিমা তাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। আমি ভাবতে লাগলাম, আর কি করা যায়। এমন সময় শিশু জিজ্ঞেস করলো, “আমি এটা নিয়ে খেলি?” তাকিয়ে দেখি ওয়ারড্রপের ওপরে রাখা বিশাল পুতুলটার দিকে আঙুল উঁচিয়ে আছে সে। তার মুখে এগাল-ওগাল জোড়া হাসি। আমিও হেসে পুতুলটা পেড়ে ওর হাতে দিলাম। তনিমা তার সমান সাইজের পুতুলটাকে বুকে চেপে ধরলো।
সত্যি বলতে এই পুতুলটা যে একটা খেলার জিনিস সেটাই আমার মাথাতে ছিল না। আমার কাছে দু ফুট লম্বা, মলিন পুতুলটা একটা বিশেষ স্মৃতিচিহ্ন। পাঁচ বছর বয়সে পুতুলটা উপহার পেয়েছিলাম বাবার কাছ থেকে। বছর সাতেক হলো, তিনি আর নেই। প্রবল মৃত্যুশোক এতোদিন পর শান্ত হয়ে এসেছে, তবে তার স্মৃতি রোদ্রোজ্জ্বল নদীর মতো- জীবিত, স্থির, টলমলে। প্রতিদিন সকালে চোখ খুলেই বিছানা বরাবর থাকা ওয়ারড্রপের উপরের পুতুলটাতে চোখ পড়ে, ঘুমাতে যাওয়ার সময়েও তাই। প্রায় আমার বয়সী পুতুলটাও যেন বাবার প্রতিনিধি হয়ে একটু উপরে বসে থেকে এই ঘরে আমার যাপিত জীবন দেখতে থাকে।
তনিমাকে আনন্দে রাখার সমস্যার সমাধান খুব দ্রুতই হয়ে গেল। এক টুকরা পুতুল নিয়ে যে কত ভাবে খেলা যায়, দীর্ঘদিন শিশুদের আশেপাশে না থাকা আমি সেটা ভুলে গিয়েছিলাম। পুতুলটাকে কোমড়ে নিয়ে সে পুরো বাড়ি অনেকবার বেড়ালো। মন দিয়ে খেয়াল করলে বোঝা যায়, পুতুলের সাথে নিচু স্বরে গল্প করছে। কখনো পুতুলটাকে আকাশে ছুঁড়ে দিয়ে ক্যাচ ধরে। কখনো বিরাট পুতুলটাকে বসিয়ে তার কোলে মাথা রেখে শোয়, কখনো নিজের কোলে শোয়ায়। একটু পর মার রান্না হয়ে গেল যখন তার জন্য মাংস নিয়ে এলাম, তখন সে নিজে খেল, পুতুলটাকেও খাওয়ালো, অন্তত চেষ্টা করলো। খেয়েদেয়ে পুতুলটার পাশে শুয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি ফের পড়াশোনার চেষ্টা করলাম।
সারাদিন গড়িয়ে বিকালে জয়নব সমস্ত কাজ শেষ করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়। তার মুখে আর ঘাম নেই। গোসলের পর সকালের জামাটা ছেড়ে সুন্দর একটা জামা পরায়, তাকে দেখেও বোঝা যাচ্ছে আজ ঈদের দিন। বুঝতে পারি, এই জামাও তার নিজের হাতে বানানো। জয়নবের মা, যিনি আসলে আমাদের বাসায় কাজ করেন সেই খালাও চলে এসেছেন। আরো তিনটি বাড়িতে কাজ করেন বিধায়, ঈদের দিনের ব্যস্ততায় তার সবগুলো কর্মস্থলে সময় দেওয়ার সময় হয় না। এইজন্যই তার মেয়েকে এই একটা দিন আমাদের বাড়িতে পাঠায় উৎসব কেন্দ্রিক কাজগুলোতে হাত লাগানোর জন্য। মা-মেয়ে যখন খেতে বসে তাদের হাসিমুখ দেখে মনে হয়, তাদের দারিদ্র্য, অন্যের ঘরে শ্রমদানের ক্লান্তি উৎসবের আনন্দ পুরোটা কেড়ে নিতে পারে নি।
আমি একসাথে খাওয়া-দাওয়ার ভেতর থাকি না। আমার ঘরে ল্যাপটপে কোনো একটা সিটকম ছেড়ে দিয়ে একলাই খাই। কিন্তু আজকের দিনে নিজের স্বভাব অনেকভাবে লঙ্ঘন করার কারণেই হয়তো ওদের খাবার টেবিলে গিয়ে বসলাম। খালা তৃপ্তি করে পান চিবোচ্চে। তার তনিমার বয়সী নাতনি থাকলেও বয়স খুব বেশি নয়, মধ্যবয়স্কই বলা চলে। জয়নবের বয়স আমার চেয়েও কম। টেনেটুনে একুশ-বাইশ হবে। এই বয়সেই বিয়ে, বাচ্চা, বিচ্ছেদ সবই হয়ে গেল। খালার কাছ থেকে পান নিয়ে আমি আর মাও খাই। কাঁচা সুপারির আবেশে যখন শরীর ঝিমঝিম করছে, তখন তনিমা ঘুম থেকে ওঠে ডায়নিং রুমে এলো। তার কোমড়ে ঝোলানো পুতুলটা। সে আমার কাছে এসে আবদারের সুরে হাসিমুখে বললো, “আমি ওরে নিয়ে যাই?” আমার আর মার মধ্যে চোখাচোখি হলো। বাচ্চাটাকে কিছু একটা দিতে আমার খুবই ইচ্ছা হচ্ছিল, কিন্তু এই পুতুলটা দেওয়া আমার সাধ্যে কুলোবে না। আমি ওকে হেসে বললাম, “তোমাকে আরেকটা নতুন পুতুল আমি কিনে দিব। এটা যে দেওয়া যাবে না।” তনিমা একটু মনক্ষুণ্ণ হয়ে বললো, “কবে?” তারিখ উল্লেখ করে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। ওর গাল টেনে বললাম, “খুব জলদি”। তনিমা মাথা নেড়ে আমার ঘরে চলে গেল। দু-মিনিট পরেই ফেরত এসে বললো, “নতুন পুতুল লাগবে না। আমি এটাই নিই?” এবার বেচারা জয়নবের কাছে ধমক খেল। মুখ কালো করে চলে যেতে মা জয়নবকে বললো, অন্য একটা পুতুল নিপা কিনে পাঠায় দিবে এখন। এই পুতুলটা নিপার বাবার দেওয়া। অনেক বছরের পুরানো পুতুল। আগেকার আমলের দামি জিনিস,ময়লা হয়ে গেছে, কিন্তু কোথাও সেলাই খোলে নি…জাপানি মাল। নিপার বাবা যখন মার্কেটে গেছিল তখন পরিচিত দোকানদার বিশাল এই পুতুল বের করে দেখালো। নতুন ওঠেছিল মার্কেটে তখন… মা বাবা সম্পর্কিত কোনো গল্প শুরু করলে অল্প সময়ে শেষ করতে পারে না। আমি উঠে চলে এলাম নিজের ঘরে। জয়নব বকশিস পেয়ে হাসিমুখে মাকে কদমবুসি করে, মেয়ের হাত ধরে চলে গেল। আমি পুতুলকে অতি যত্নে ওয়ারড্রপের উপর তার সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করলাম।
তনিমার জন্য একটা নতুন পুতুল খুব জলদি কিনতে পারলাম না। পরীক্ষার আগে মার্কেটে যাওয়া হলো না। পরীক্ষার পরেও দিন গড়াতে থাকে, মার্কেটে যাওয়া হয় না। আসলে অন্য কিছু শপিং করার না থাকলে শুধু পুতুল কেনার জন্য যাওয়া কঠিন আমার জন্য। এরপর আস্তে আস্তে ব্যাপারটা একরকম ভুলেই গিয়েছিলাম। এমনকি একদিন কিছু কেনাকাটা করতে শপিং মলে গেলেও, পুতুল কেনার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। পরে বসায় ফেরত এসে আমার পুতুলটাকে যখন তাকিয়ে থাকতে দেখলাম, তখন জিভ কাটলাম। বড্ড ভুল হয়ে গেছে। যাক, পরেরবার অবশ্যই কিনব। এভাবে পুরো ব্যাপারটাই স্মৃতির গহ্বরে হারিয়ে যে যেত না, এই গ্যারান্টি দিতে পারি না। কিন্তু একদিন একটা ব্যাপার ঘটলো।
সকালে কফিতে চুমুক দিতে দিতে পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছিলাম। শেষের পাতায় এক মারাত্মক খবরে চোখ আটকে গেল। ছয় বছরের এক কন্যাশিশুর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার। শ্বাসরোধে হত্যা। ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকতে পারে, মনে করছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। মেয়েটির মা একটা দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে কাঁদছে- এরকম একটা ছবিও ছাপা হয়েছে। মায়ের অতি অল্প বয়স। টেনেটুনে একুশ-বাইশ। গলার কণ্ঠা, কবজির হাড় বিসদৃশভাবে চোখে পড়ে। গার্মেন্টসে কাজ করে। এই অভাগ্য অল্পবয়সী মা টি জয়নব হতে পারতো, কিন্তু সে নয়। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, নিহত শিশুর লাশ যে বস্তা থেকে বের করা হয়েছে, সেখানে একটা পুতুল ছিল। পুলিশ ধারণা করছে, মা কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর, বড় বোন যখন রাঁধতে রান্নাঘরে যায়, তখন এই পুতুলের লোভ দেখিয়েই হয়তো খুনী সরল শিশুকে ঘর থেকে বের করে আনে। পুতুলটি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, গুরত্বপূর্ণ আলামত, ক্লু পাওয়া যেতে পারে।
সামান্য পুতুলের ফাঁকি দিয়ে শিশু হত্যার এই ঘটনা পড়ার পরপরই আমি মার্কেটে চলে গেলাম, তনিমার জন্য পুতুল কিনতে। না গেলে চলতো না আসলে, এই ভয়াবহ ঘটনার অস্বস্তি মাথায় চেপে থাকতো, অনেকক্ষণ এবং অনেকদিন ধরে। আমি অস্বস্তি বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারি না। আমার পুতুলটার কাছাকাছি আকৃতির আর চেহারার পুতুল খুঁজতে লাগলাম। খেয়াল করলাম, থেকে থেকে শুধু মৃত শিশুর মায়ের ছবিটার কথা মনে পরছে। তরুণীর বাম গাল বেয়ে নেমে আসা অশ্রুর বড় ফোঁটা বড্ড স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল ছবিতে। ফটো সাংবাদিককে বাহবা দিতে হয়! নিখুঁত এঙ্গেল এবং টাইমিং! আমাদের বাথরুমে নিচু মাথায় কর্মব্যস্ত জয়নব মুখ যখন মা ডাক শুনে মুখ তুলেছিল, তারও বাম চিবুক বেয়ে নোনা পানির বিন্দু চুইয়ে নামতে স্পষ্ট দেখেছিলাম। আসলে এই দুটো পরিবার আর এই দুটো দৃশ্যের সাদৃশ্য এতো বেশি যে, আমার ভেতরে একধরনের ভয় মিশ্রিত অপরাধবোধ জন্ম নিয়েছিল। নাহলে প্রতিদিন কতো শিশুই তো কতো বিশ্রীভাবেই মারা যায়! তাদের মধ্যে বহুজনই তো তনিমার মতো! কিইবা করার আছে তাতে!
খুঁজে-পেতে তনিমার জন্য যে পুতুল কিনলাম, তা দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বিশাল সাইজের পুতুল। এতো বড় যে, আলো-আধারিতে হুট করে দেখলে প্রথমে মানুষ আঁতকে ওঠবে। পরে অবশ্য হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে, কারণ পুতুলের চেহারাটি অত্যন্ত কমনীয়, বেশ একটু দেবি দেবি চেহারা। বেশ কিছু টাকা বেরিয়ে গেল, পুতুলের এতো দাম কে জানতো! কিন্তু সকালবেলার প্রবল অস্বস্তিও ওই টাকার সাথেই বেরিয়ে গেলো। উৎফুল্ল মনে বাসায় ফিরলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, পুতুলটা তনিমার নানীর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিব। কিন্তু পুতুলটার চটক যতই বেশি করে চোখে পড়তে লাগলো, ততই তনিমা এটা হাতে নিয়ে কি করে সেটা দেখার ইচ্ছা ফুলে ওঠতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম, মাকে দিয়ে জয়নবকে নিমন্ত্রণ করা যাক, সে তনিমাকে নিয়ে আসবে।
মানুষের হিসাব জীবনে অগণিতবার ভুল প্রমাণিত হয়। এই পুতুল-কাহিনীর শেষটাও হিসাবের ভুল দিয়েই শেষ হয়েছিল। দুদিন পর জয়নব একাই আসে নিমন্ত্রণ রাখতে, তনিমা আসে নি। তনিমা আর ওর মায়ের সাথে থাকে না। তাকে কয়েকমাস আগে গ্রামের বাড়িতে রেখে এসেছে জয়নব। ঢাকায় খরচ বেশি, তনিমা একা একা থাকে, মা আর নানি কাজে বেড়িয়ে গেলে। অনেক চিন্তাভাবনা করে গ্রামে মামা-মামীদের কাছে রেখে এসেছে। ওখানে ও ভালোই থাকবে। এই সংবাদে মনের ভেতর জেগে ওঠা নানা রকম অনুভূতি চাপা দিয়ে ভাবলাম, হ্যাঁ, হয়তো ওখানে তনিমা ভালোই থাকবে। তবে এই শিশুর রক্ষক কে হবে, যেখানে প্রতিদিন এদেশে অজস্র শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, যার অধিকাংশই নিকটাত্মীয়ের দ্বারা! তাদের শৈশব কালো অন্ধকারে ঢেকে দেয় পরিচিত কিছু হাত। অবশ্য সেই মৃত শিশুটা তো মা-বোনের কাছেই ছিল। রক্ষা তো পেল না। তাই তনিমা হয়তো ভালোই থাকবে, গ্রামের মুক্ত পরিবেশে, এই অবন্ধুসুলভ শহর থেকে অনেক দূরে, সমবয়সী অনেক সঙ্গী-সাথী নিয়ে। আমি পুতুলটা জয়নবের হাতে তুলে দিই। জয়নব পুতুলের আকৃতি ও সৌন্দর্যে আশ্চর্য হয়ে যায়!