বিশেষ প্রতিনিধি, ক্রাইম ক্রনিকলস
সিলেটের জাফলং মানেই পর্যটকদের চোখে পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল আর পাহাড়ঘেরা অপরূপ এক স্বর্গভূমি। কিন্তু এই অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে প্রশাসনের নাক ডগা দিয়ে নীরবে ঘটে গেছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধ্বংসের এক নির্মম অপরাধযজ্ঞ। লোভের কালো থাবায় আজ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে শত শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী ঐতিহাসিক ‘জাফলং রাজবাড়ী’ (যা স্থানীয় খাসিয়া সম্প্রদায়ের কাছে 'বল্লাপুঞ্জী রাজবাড়ী' বা 'মন্দিরের জুম' নামেও পরিচিত)। মাফিয়া চক্রের অনিয়ন্ত্রিত পাথর ও বালু উত্তোলন এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অবহেলার কারণে দেশের এই প্রাচীন সাংস্কৃতিক নিদর্শনটি এখন প্রায় নিশ্চিহ্ন।
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৩০০ শতাব্দীরও আগে এই অঞ্চলে প্রাচীন মালনিয়াং বা মাধুর মাস্কুট রাজ্যের শাসন ছিল। নিয়াং, কল্লং ও কন্দুর রাজাদের ধারাবাহিকতায় এই বংশের শেষ শাসক ছিলেন মাইলং রাজা। এই মাইলং রাজারই প্রধান আবাস ও দুর্গ ছিল জাফলংয়ের এই রাজবাড়ী। পরবর্তীতে ১৪৫০ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে জৈন্তিয়া সাম্রাজ্য একীভূত হওয়ার পর জৈন্তিয়ার রাজারাও এই দুর্গ ও রাজবাড়ীটি ব্যবহার এবং সংস্কার করতেন। ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক জৈন্তিয়া রাজ্যের পতনের পর এই ঐতিহাসিক স্থাপনার ওপর প্রথম আঘাত আসে। তবে প্রকৃতির বুকে মাথা উঁচু করে রাজবাড়ীটি টিকে ছিল আরও বহু বছর।
কিন্তু স্বাধীনতার পর রাজবাড়ীটি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ তো নেওয়াই হয়নি, উল্টো গত কয়েক দশকে জাফলং সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠে অবৈধ পাথরখেকো সিন্ডিকেট। ইসিএ (প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা) ঘোষিত এই অঞ্চলে রাতের আঁধারে এবং দিনের আলোয় নিষিদ্ধ ‘বোমা মেশিন’, শত শত শ্যালো মেশিন ও ভারী এক্সকেভেটর (যন্ত্রদানব) দিয়ে নির্বিচারে মাটির গভীর থেকে পাথর উত্তোলন শুরু হয়।

পাথরখেকো মাফিয়াদের এই লাগামহীন তৎপরতার কারণে ডাউকি ও পিয়াইন নদের স্বাভাবিক গতিপথ বদলে যায় এবং তীব্র নদীভাঙন দেখা দেয়। এই কৃত্রিম নদীভাঙনের ফলে রাজবাড়ীর মূল অংশ, এর পশ্চিম ও উত্তর পাশের বিশাল দেয়াল ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
বর্তমানে প্রাচীন রাজবাড়ীটির কেবল দক্ষিণ পাশের জরাজীর্ণ রাজকীয় ফটক এবং পূর্ব পাশের দেয়ালের অর্ধেক অংশ কোনোমতে টিকে আছে। পাথর উত্তোলনের কারণে মাটির ভেতরের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রতি বর্ষায় অবশিষ্ট দেয়াল ধসে পড়ছে। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল একটি স্থাপনার ক্ষতি নয়, বরং তাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস ও নিজেদের জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলার এক পরিকল্পিত অপরাধ। ক্ষমতার প্রভাবের কারণে পাথরখেকোদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না সাধারণ মানুষ।
পরিবেশবিদ ও সচেতন মহলের মতে, জাফলংয়ের এই ঐতিহ্য ধ্বংসের ঘটনাটি আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির ওপর একটি বড় আঘাত। অতি দ্রুত পুরো রাজবাড়ী এলাকাটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে সংরক্ষিত ঘোষণা করা, সীমান্ত এলাকায় সম্পূর্ণভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ করা এবং নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না করলে অচিরেই মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে পাঁচশ বছরের প্রাচীন জাফলং রাজবাড়ী। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে ইতিহাসের এই নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ এখনই থামানো প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।