স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল


বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। সমুদ্রের নীল, ফেনিল জলরাশির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই দ্বীপ শুধু পর্যটনের জন্যই নয়; এটি হাজারো মানুষের বসবাস, জীবিকা ও সংস্কৃতিরও ধারক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে আছে বঞ্চনা, অবহেলা ও নানাবিধ সংকটের গল্প। দ্বীপবাসীর ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে আজ দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সেন্টমার্টিন স্টুডেন্টস ইউনিটি। সংগঠনটি আরাকান আর্মির হাতে আটক সকল বাংলাদেশি জেলেকে দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানায়।




সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজার সরকারী কলেজের গণিত বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জামিল উদ্দীন (২২) বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে সেন্টমার্টিনের অন্যতম বড় সমস্যা হলো আরাকান আর্মির হাতে বাংলাদেশি জেলেদের আটক হওয়া। বিষয়টি এখন আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।” তিনি জানান, সমুদ্রে মাছ ধরার ওপর সরকারি বিভিন্ন বিধিনিষেধ এবং বর্ষা মৌসুমের কারণে জেলেরা বছরের বড় একটি সময় মাছ ধরতে যেতে পারেন না, ফলে তারা ও তাদের পরিবার নিয়মিত অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।


তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলবর্তী এলাকায় মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় জেলেদের বাধ্য হয়ে গভীর সমুদ্রে যেতে হচ্ছে। এ সুযোগে জলসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি সংগঠন আরাকান আর্মি বাংলাদেশি জেলেদের আটক করছে। তার দাবি, গত এক বছরে সাত শতাধিক (৭০০+) জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বন্দিদশায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন; এমনকি কিছু জেলেকে শ্রমশিবিরে ক্রীতদাসের মতো পাথর কাটার কাজে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে।


গত বছরের ২৭ অক্টোবর মাছ ধরতে গিয়ে একইভাবে আটক হন সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা আমান উল্লাহ (৩৮)। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি মুক্তি পাননি। তার অনুপস্থিতিতে পরিবারটি চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। তার ছেলে মোহাম্মদ জিল্লুর (১৫), বাবার অনুপস্থিতিতে পড়াশোনা ছেড়ে দিনমজুরের কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছে। গতবছর তিনি সেন্টমার্টিন বিএন স্কুল & কলেজে অষ্টম শ্রেণিতে পড়তেন।




মোহাম্মদ জিল্লুর অভিযোগ করে বলেন, “সরকার আমাদের জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না; আমাদের যেন পূর্ণ নাগরিক হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে না।” তিনি আসন্ন কোরবানির ঈদের আগেই আটক সকল জেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।


সংবাদ সম্মেলনে দ্বীপের সার্বিক উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে ১৩ দফা দাবি তুলে ধরে সেন্টমার্টিন স্টুডেন্টস ইউনিটি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—দ্বীপের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের আধুনিকায়ন এবং সি-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা। এছাড়া নিরাপদ ও উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ও টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিন -সহ সকল  সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার, বাস্তবসম্মত মৎস্যনীতি প্রণয়ন এবং পরিকল্পিত ইকো-ট্যুরিজম চালুর দাবিও জানানো হয়।


সংগঠনটি আরও দাবি জানায়—উপকূল সুরক্ষায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, মাদক নির্মূল, মানবপাচার প্রতিরোধ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দ্বীপের ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধান।