স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল
ভারতের বাংলা দৈনিক ‘এই সময়’-কে গত ৯ জুন নয়াদিল্লি থেকে দেওয়া এক দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ধারা পাকিস্তানমুখী হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। তার মতে, বর্তমানে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে ঘনিষ্ঠতা দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা নিহিত রয়েছে।
সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের আরও কাছাকাছি চলে যাচ্ছে এবং এই পরিবর্তনকে তিনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন।
জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা আর পাকিস্তানি ভাবধারায় রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে নেওয়া, দুটো এক বিষয় নয়।”
তিনি বলেন, “পাকিস্তানের সঙ্গে যে কোনো সম্পর্ক হতে হবে ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করে, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষা করে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে।”
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করা, পাকিস্তানপন্থী শক্তিকে পুনর্বাসিত করা, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানো এবং তরুণ প্রজন্মকে পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে, তার মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।”
বর্তমান সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে ‘নতুন কূটনীতি’ বা ‘ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “পাকিস্তান কি ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে? তারা কি যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করেছে? তারা কি বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতকে সম্মান দিয়েছে?”
তার ভাষ্য, “যদি না করে, তাহলে এত তাড়াহুড়ো করে সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা কেন?”
শেখ হাসিনার দাবি, পাকিস্তানের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্ন নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, “পাকিস্তানের সঙ্গে এই অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা শুধু কূটনৈতিক বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। যারা ১৯৭১-কে ভুলে যান, তারা বাংলাদেশকে বুঝতে পারেন না। যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছায়ায় ফেরাতে চান, তারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিপজ্জনক খেলা খেলছেন।”
সাক্ষাৎকারে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “যারা ভেবেছিলেন বিএনপি ক্ষমতায় এলে জামায়াতের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো হবে, তারা ইতিহাস ভুলে গিয়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।”
তার দাবি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর পুনর্বাসন বিএনপির হাত ধরেই হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জামায়াত বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী। মুখে ভিন্ন নীতি-আদর্শের কথা বললেও তারা উভয়েই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক চেতনার অংশীদার।”
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা প্রশ্ন তোলেন, “যদি মানুষ জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিয়ে থাকে, তাহলে বিএনপি কেন মৌলবাদী শক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? কেন মাজারে হামলা হচ্ছে? কেন সুফিদের দরগা নিরাপদ নয়? কেন সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন?”
তিনি আরও বলেন, “কেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া, আদিবাসী— কেউই নিরাপদ বোধ করছেন না? কেন পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃতি, প্রশাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর আঘাত আসছে?”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বর্তমান সরকার বা বিএনপির কোনো প্রতিক্রিয়া সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়নি।
ভারত ও বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শেখ হাসিনা বলেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভারত যে কোনো সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, সেটিই স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক, তাদের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ থাকবে— এটাই স্বাভাবিক।”
ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক উন্নয়নের ফলে তার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “আমার অবস্থান দুর্বল হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ আমার অবস্থান নির্ভর করে বাংলাদেশের মানুষের ওপর।”
একইসঙ্গে কঠিন সময়ে সহযোগিতা দেওয়ার জন্য ভারত সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমি ভারতের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমার অবস্থান অন্য কোনো রাষ্ট্র কিংবা সরকারের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল নয়।”
দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তার ভাষ্য, “দু’দেশের টেকসই সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি হলো বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা।”
তিনি আরও বলেন, “যারা এগুলো নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভারতবিরোধী অপপ্রচারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন এবং অতীতে ভারতের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাদের সঙ্গে ভারতের কোনো নতুন ইনিংসই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা নয়।”
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আরও বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কেবল দুই সরকারের পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইতিহাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং দুই দেশের জনগণের স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত।