আন্তর্জাতিক প্রতিবেদক


যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমা (Presidential Pardon) পাওয়ার প্রক্রিয়া ঐতিহাসিকভাবে বিচার বিভাগ (Department of Justice) এর Office of the Pardon Attorney এর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। কিন্তু রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে এই প্রক্রিয়া এখন ক্রমশ অনানুষ্ঠানিক প্রভাব, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক আনুগত্যনির্ভর হয়ে উঠেছে।


রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, এখন অনেক দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সরাসরি বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হওয়ার বদলে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, রাজনৈতিক মিত্র, মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার কিংবা লবিস্টদের সাহায্য খোঁজেন। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র (ববি), রজার স্টোন এবং অ্যালিস জনসনের মতো ব্যক্তিদের নাম যাদের মাধ্যমে ট্রাম্পের কাছে পৌঁছানো সহজ বলে বিবেচিত হচ্ছে।



রজার স্টোন নিজে প্রেসিডেন্টের পারডন লাভ করে এখন অন্যদের পথ দেখাচ্ছেন কিভাবে ট্রাম্প মহলে তদবির করে পারডন আদায় করতে হয়। ছবি রয়টার্স 


প্রেসিডেন্টের ক্ষমা পাওয়ার ক্ষেত্রে মামলার আইনি মেরিটের চেয়ে রাজনৈতিক সম্পর্ক, মিডিয়ায় উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প নিজেও বহুবার দাবি করেছেন যে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত হয়েছে। ফলে তার সমর্থকেরা মনে করছেন, একই ধরনের ভাষ্য ট্রাম্পের কাছে সহানুভূতি আদায়ে কার্যকর হতে পারে। 


রয়টার্স কয়েকশ প্রেসিডেন্টশিয়াল পারডন আবেদন, লবিং নথি, প্রচার তহবিলের তথ্য এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে ক্ষমা পাওয়ার জন্য এখন একটি অঘোষিত প্রভাব-বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। অনেক আবেদনকারী রাজনৈতিক অনুদান, মিডিয়া প্রচারণা এবং ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্কের সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।



নিকোলার সাবেক প্রধান ট্রেভর মিল্টন বিনিয়োগকারীদের টাকা প্রতারণার দায়ে দণ্ডিত হওয়ার পর ট্রাম্পের ক্লোজ সার্কেলে বড় অংকের টাকা অনুদান দিয়ে ক্ষমা আদায় করে নেন। ছবি রয়টার্স


প্রতিবেদনে ট্রেভর মিল্টনের উদাহরণ বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। বৈদ্যুতিক ট্রাক কোম্পানি নিকোলার সাবেক প্রধান ট্রেভর মিল্টন প্রতারণার দায়ে দণ্ডিত হওয়ার পর ট্রাম্প-সমর্থিত রাজনৈতিক মহলে সক্রিয় হন এবং বড় অঙ্কের টাকা ডোনেট করেন। পরে তিনি প্রেসিডেন্টের পারডন লাভ করেন। ক্রিটিকদেন মতে, এটি প্রমাণ করে যে ক্ষমা প্রক্রিয়ায় অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


প্রতিবেদনে আরো উঠে এসেছে যে, কিছু পরামর্শক ও মধ্যস্থতাকারী এখন কার্যত পারডন স্পেসিয়ালিস্ট  হিসেবে কাজ করছেন। তারা আবেদনকারীদের শেখান কীভাবে নিজেদেরকে 'ডিপ স্টেট' বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে, কীভাবে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ মহলে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে এবং কীভাবে জনমত তৈরি করতে হবে।



ট্রাম্প ও ক্ষমা বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা ম্যারি জনসন। ছবি রয়টার্স


গত বছর ট্রাম্প অ্যালিস ম্যারি জনসনকে তার পারডন জার (ক্ষমা বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা) হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তাঁকে আদালতের দ্বারা অন্যায়ভাবে শাস্তিপ্রাপ্ত অন্যান্যদের খোঁজার নির্দেশ দেন। জনসন  ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পাওয়া ব্যক্তিদের ্মধ্যে অন্যতম। ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে তাঁদের দুজনকে একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল।


হোয়াইট হাউস অবশ্য রয়টার্সকে জানিয়েছে যে, আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া এখনো কার্যকর রয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষমা আবেদন সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়। তবে রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, বাস্তবে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও রাজনৈতিক আনুগত্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


সমালোচকেরা বলছেন, এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার নৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করছে। কারণ ঐতিহ্যগতভাবে ক্ষমা প্রদানের ক্ষেত্রে অপরাধের প্রকৃতি, অনুশোচনা, পুনর্বাসন এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন বিবেচনা করা হতো। এখন সেখানে ধনী, প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।


রয়টার্স তাদের এই অনুসন্ধানে নথিপত্র, সাক্ষাৎকার, আদালতের রেকর্ড, রাজনৈতিক অনুদানের তথ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।