আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১২৯ জন। ভূমিকম্পের পর ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও জাপানের উপকূলীয় এলাকায় সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বহু ভবন ধসে পড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের কিছু আগে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের সারাঙ্গানি প্রদেশের মাসিম এলাকার পশ্চিমে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের নিচে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ৩৩ কিলোমিটার।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি জেনারেল সান্তোসে
ভূমিকম্পের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরনগরী জেনারেল সান্তোসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একটি জনপ্রিয় ফাস্টফুড রেস্তোরাঁসংবলিত ভবন মুহূর্তেই ধসে পড়েছে। ধুলোর মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আশপাশের এলাকা। আতঙ্কিত মানুষ জীবন বাঁচাতে দৌড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়।
এ ছাড়া নটর ডেম অব দাদিয়াঙ্গাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবনও ধসে পড়েছে। সৌভাগ্যবশত ভবনটিতে তখন কেউ অবস্থান করছিল না। শহরের একটি হাসপাতালের উঁচু তলায় ফাটল দেখা দেওয়ায় রোগী ও চিকিৎসাকর্মীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়।
হতাহত বাড়তে পারে
ফিলিপাইনের সিভিল ডিফেন্স দপ্তর জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ১৫ জন নিহত ও ১২৯ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সারাঙ্গানি প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় দোকানের সাইনবোর্ড ভেঙে পড়েছে, জানালার কাচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে এবং কংক্রিটের দেয়াল ধসে পড়েছে। ভূমিকম্পের সময় একটি স্কুলে থাকা শিশুদের আতঙ্কিত হয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে। স্থানীয় এক ভিডিওতে দেখা যায়, কাঁপুনির মধ্যে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের জড়িয়ে ধরে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
১৩৮টি আফটারশক
ফিলিপাইনের আগ্নেয়গিরি ও ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ সংস্থা (ফিভলকস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ১৩৮টি আফটারশক বা পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীটির মাত্রা ছিল ৬.৭।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পরাঘাত আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে প্রবেশ না করার জন্য স্থানীয়দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সুনামি সতর্কতা
ভূমিকম্পের পরপরই প্রশান্ত মহাসাগরীয় সুনামি সতর্কতা কেন্দ্র জানায়, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, পালাউ, তাইওয়ান ও পাপুয়া নিউগিনির উপকূলে সুনামির ঢেউ আঘাত হানতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুলাওয়েসি অঞ্চলে প্রায় ০.৭৫ মিটার উচ্চতার ঢেউ শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সাঙ্গিহে দ্বীপপুঞ্জসহ উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের উঁচু স্থানে সরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থাও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলজুড়ে সুনামি সতর্কতা জারি করেছে। কিছু এলাকায় ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং সমুদ্রসৈকত খালি করে দেওয়া হয়েছে।
প্রেসিডেন্টের জরুরি নির্দেশ
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট Ferdinand Marcos Jr. মিন্দানাও অঞ্চলে জরুরি দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “জাতীয় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। মিন্দানাওয়ের মানুষকে আমরা একা ছেড়ে দেব না।”
ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনীও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ ইউনিট মোতায়েন করেছে।
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল ফিলিপাইন
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় ফিলিপাইনে প্রায়ই ভূমিকম্প আঘাত হানে। মাত্র আট মাস আগে দেশটিতে ১২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পে ৭৯ জন নিহত হয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এই ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প চলতি বছরে ফিলিপাইনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এর ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত পরিস্থিতি জানা সম্ভব হবে না।