বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

"মানসম্মান, দলের পদ সবই হারিয়েছি। বিগত বেশ কয়েকদিন ধরে আমি আর আমার স্ত্রী মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছি। অথচ সত্য না জেনেই মিডিয়া ট্রায়াল ও প্রতিপক্ষের উৎসব চলেছে। কেউ আমাদের মানসিক অবস্থা জানতে চায়নি, সত্যটাও না।"— গতকাল শনিবার (১৩ জুন) এভাবেই ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিজের স্বপ্নের চবি ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ও বর্বরোচিত ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০২১-২০২২ সেশনের শিক্ষার্থী ও চবি শাখা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল সাকিফ রহমান।

গত ২৩ মে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়িয়ে পড়া 'আপত্তিকর অবস্থায় ছাত্রদল নেতা আটক' সংবাদের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য তুলে ধরে তিনি নিজের ও তাঁর স্ত্রীর নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বয়ান অনুযায়ী, ঘটনার দিন (২৩ মে) তিনি ও তাঁর স্ত্রী ঘরে ঢোকার পরপরই কিছু লোক দরজায় নক করতে থাকে। তিনি তখন গোসলে ছিলেন। পরিস্থিতি দেখতে বের হতেই দেখা যায় বেশ কয়েকজন ক্যামেরা অন করে ওপরের দিকে উঠে আসছে। তিনি বারবার তাদের ভিডিও বন্ধ করে কথা বলার অনুরোধ জানালেও, বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে উগ্র আচরণের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি দরজা বন্ধ করে দেন এবং তাঁর স্ত্রীকে ওয়াশরুমে অবস্থান নিতে বলেন।


পরবর্তীতে হামলাকারীরা মেইন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ওই শিক্ষার্থীকে লাথি, কিল-ঘুষি এবং দেশীয় অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। এরপর তারা ওয়াশরুমের দরজাও ভেঙে ফেলে এবং তাঁর স্ত্রীকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে ভিডিও করতে থাকে। ভুক্তভোগী বলেন, "আমি বারবার চিৎকার করে বলছিলাম মেয়েটি আমার বিবাহিত স্ত্রী। কিন্তু তারা আমার প্যান্ট ধরে টানাটানি করে, মারধর চালায় এবং কোনো কথা না শুনে ভিডিও করতে থাকে।"

হামলাকারীরা কেবল শারীরিক ও মানসিক হেনস্তাই করেনি, বরং পরিকল্পিতভাবে লুটপাট চালিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এই শিক্ষার্থী। তিনি জানান, তাঁর স্ত্রীর ল্যাপটপসহ ব্যাগ, নিজের ল্যাপটপ, মানিব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ এবং নগদ ১০ হাজার টাকাসহ প্রায় দুই লাখ টাকারও বেশি মূল্যের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। এছাড়া তাঁর স্টুডেন্ট আইডি কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ট্যাক্স টোকেনসহ বেশ কিছু মূল্যবান নথিপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। হামলাকারীদের অনেককেই তিনি চিনতে পেরেছেন এবং প্রয়োজনে সবার নাম প্রকাশ করবেন বলে জানান।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ত্রীকে কেন 'বান্ধবী' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল— সেই ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে তিনি জানান, এটি ছিল সম্পূর্ণ পারিবারিক সিদ্ধান্তের অংশ। পারিবারিকভাবে ছাত্রাবস্থায় তাঁদের বিয়ে হলেও দুই পরিবারের মুরুব্বিদের কঠোর নির্দেশ ছিল বিষয়টি গোপন রাখার। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় পরবর্তীতে বড় পরিসরে অনুষ্ঠান করে আত্মীয়-স্বজনকে জানিয়ে কনে তুলে নেওয়ার কথা ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে এবং দুই পরিবারের আত্মীয়-স্বজনদের সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে তাৎক্ষণিকভাবে তারা বিয়ের বিষয়টি জনসমক্ষে আনেননি। পরবর্তীতে দুই পরিবার বসে আইনিভাবে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখন সত্যটি সামনে আনা হয়েছে।

ঘটনার পর অন্য কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে ফাঁসানোর অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন ওই শিক্ষার্থী। তিনি স্পষ্ট করেন, ঘটনাস্থলে এবং পরবর্তীতে প্রক্টর ও নিরাপত্তা দপ্তরের কাছে তিনি নিজের এবং তাঁর স্ত্রীর সঠিক নাম-পরিচয়ই দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যাদের নাম এই ঘটনায় জড়ানো হয়েছে, তাদের তিনি চেনেনও না।

একজন আইনের ছাত্র হিসেবে দেশের প্রচলিত আইনের ওপর আস্থা রেখে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী, আইন অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গ এবং যে রাজনীতির কারণে তিনি আজ রোষানলের শিকার, সেই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।


তিনি বলেন, "কোনো রকম আপত্তিকর অবস্থায় না পেয়েও যারা মনগড়া নিউজ করে আমার মানহানি করেছেন, আশা করি সত্য জানার পর অন্তত আপনারা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়াবেন। আজ যদি সবাই চুপ থাকেন, তবে ভবিষ্যতে এরা কাউকে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করবে না।"

সবশেষে তিনি জানান, সমস্ত ভয় ও ট্রমা কাটিয়ে তিনি তাঁর স্বপ্নের চবি ক্যাম্পাসে সস্ত্রীক ফিরবেন এবং যারা বিস্তারিত জানতে চান বা তাঁদের বিয়ের মিষ্টি খেতে চান, তাদের স্বাগত জানাবেন।